সৈকতে চিংড়ির স্তূপ, খেতে নিষেধ করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়

· Prothom Alo

অনেকের ধারণা, সাগরের পাড়ে মরা মাছ বা চিংড়ি ভেসে আসা মানেই কোনো বড়সড় দুর্ঘটনা। হয়তো জাহাজ থেকে তেল ছড়িয়েছে, হয়তো কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য এসে মিশেছে। মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে সাগরে এত দূষণ ঘটছে যে এমন ভাবনা একদম স্বাভাবিক। কিন্তু সব সময় এটা সত্য নয়। মাঝে মাঝে এর পেছনে থাকে নিছকই প্রকৃতির একটা নিজস্ব কার্যক্রম, যেটা মানুষ অনেক বছর ধরেই দেখে আসছে।

ঠিক এমনই এক রহস্যময় দৃশ্যের মুখোমুখি হয়েছেন সম্প্রতি ওমানের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। দেশটির দোফার প্রদেশের মিরবাত শহরের সৈকতে হঠাৎ ভেসে এসেছে টন টন ছোট লাল চিংড়ি। সাদা বালু ঢেকে গেছে লাল চাদরের মতো এক স্তূপে। ছবি দেখে অনেকেই ভেবেছেন, নিশ্চয় সাগরে ভয়ংকর কিছু ঘটেছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে যে কারণ বের করেছেন, সেটা শুনলে অবাকই হবে।

Visit sweetbonanza.qpon for more information.

ওমানের কৃষি, মৎস্য ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সঙ্গে সঙ্গে একদল বিশেষজ্ঞ পাঠিয়ে দেয় মিরবাতে। তাঁরা সৈকতের নানা জায়গা থেকে পানি ও চিংড়ির নমুনা সংগ্রহ করেন। ল্যাবে নিয়ে গিয়ে যত্ন করে পরীক্ষা করেন। দীর্ঘ পরীক্ষা–নিরীক্ষার পর তাঁরা বললেন, এর পেছনে কোনো দূষণ নেই। নেই কোনো বিষাক্ত রাসায়নিক। অন্য কোনো সামুদ্রিক প্রাণীও এখানে মারা যায়নি। শুধু এই ছোট লাল চিংড়িগুলোই কেন যেন তীরে ভেসে এসেছে।

১০ বছর পর আবার ফিরেছে নাইজেরিয়ার ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার উৎসব আরগুঙ্গু

এই চিংড়িগুলো আসলে আমাদের পরিচিত বাজারের চিংড়ি না। এরা একদম ছোট্ট আকারের। যাকে বলে ক্রিল। এই ছোট প্রাণীরা ভীষণ স্পর্শকাতর। সাগরের পরিবেশে একটু এদিক-ওদিক হলেই এদের শরীর সইতে পারে না। আমরা যেমন গরমকালে ঠান্ডা ঘরে বসে আছি, হঠাৎ কেউ বাইরে কড়া রোদে ঠেলে দিলে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারি; অনেকটা সে রকম।

অক্সিজেন কমে গেলে চিংড়িগুলো শ্বাস নিতে পারে না। দম আটকে আসে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রধানত তিনটি কারণ মিলে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। প্রথম কারণ হলো অক্সিজেনের অভাব। সাগরের গভীরে মাঝেমধ্যে এমন কিছু এলাকা তৈরি হয়, যেখানে পানিতে অক্সিজেন একদম কমে যায়। আমাদের বাঁচতে যেমন বাতাস লাগে, পানির নিচের প্রাণীদেরও বাঁচতে অক্সিজেন লাগে। অক্সিজেন কমে গেলে চিংড়িগুলো শ্বাস নিতে পারে না। দম আটকে আসে। দ্বিতীয় কারণ তাপমাত্রা। সাগরের গভীরে পানির তাপমাত্রা যদি হঠাৎ বেড়ে যায় বা কমে যায়, এই ছোট প্রাণীরা সামলাতে পারে না। মানুষের জ্বর হলে যেমন শরীর কাঁপতে থাকে, এদেরও তেমন একটা অবস্থা হয়। কিন্তু এদের বেলায় এই কাঁপুনি প্রায়ই মৃত্যুতে গিয়ে শেষ হয়। তৃতীয় কারণ সাগরের প্রবল স্রোত। শক্তিশালী স্রোত মাঝে মাঝে এই দুর্বল প্রাণীদের গভীর সমুদ্র থেকে ঠেলে অগভীর জায়গায় নিয়ে আসে। অগভীর সাগর এদের জন্য একদমই উপযুক্ত না। তাই এরা টিকতে পারে না। স্রোতের ধাক্কায় ভেসে চলে আসে একদম তীর পর্যন্ত।

এই ঘটনা শুনে অনেকে হয়তো অবাক হবে, কিন্তু ওমানের সাগরে এ রকম ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটে। প্রতি এক থেকে তিন বছর পরপর একবার এমন দৃশ্য দেখা যায়। ওমান আর ইয়েমেনের উপকূলে এটি একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা।

কিছু মাছ স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটে কেন

ঠিক গত বছরই দোফার প্রদেশের রাখিউত উপকূলে একই রকম কাণ্ড ঘটেছিল। তখন বিজ্ঞানীরা ল্যাবে পরীক্ষা করে চিংড়ির পরিচয়ও বের করে ফেলেছিলেন। এর বৈজ্ঞানিক নাম Challengerosergia umitakae। এরা সাগরের তাপমাত্রার সামান্য পরিবর্তনেও মারা পড়ে।

দেশটির দোফার প্রদেশের মিরবাত শহরের সৈকতে হঠাৎ ভেসে এসেছে টন টন ছোট লাল চিংড়ি

ছোট ক্রাস্টেশিয়ান, মানে চিংড়ি বা ক্রিলের মতো প্রাণীরা পরিবেশের অল্প পরিবর্তনেও বেশি কাবু হয়। বড় মাছ বা কাঁকড়ার শরীর শক্তপোক্ত। তারা একটু উল্টোপাল্টা সইতে পারে। কিন্তু এই ছোট প্রাণীদের শরীর একদম কোমল। সাগরের পানিতে অক্সিজেন একটু কম হলে, তাপমাত্রা একটু বেশি বদলালে, এরাই সবার আগে বিপদে পড়ে। বিজ্ঞানীরা এদের তাই বলে থাকেন সাগরের ‘ইন্ডিকেটর প্রাণী’। মানে এরা যেন সাগরের শরীরের জ্বর মাপার থার্মোমিটার। সমুদ্রের পরিবেশ এলোমেলো হলে এরাই প্রথম জানিয়ে দেয়। ওমানের কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে, সৈকত থেকে কুড়িয়ে এই চিংড়ি খাওয়া যাবে না।

পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মহাসাগরের ভেতরও এমন ছোট ছোট ব্যাপার ঘটে, যেগুলো মাঝে মাঝে আমাদের চোখের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। মিরবাতের লাল সৈকত আসলে একটা সিনেমার মতো দৃশ্য। আবার একই সঙ্গে এটা প্রকৃতির ছোট্ট একটা বার্তাও। সাগরের গভীরে কী ঘটছে, সেটা আমরা সব সময় দেখতে পাই না। কিন্তু সাগরের ছোট প্রাণীরা ঠিকই টের পায়। আর কখনো-কখনো নিজের প্রাণ দিয়ে আমাদের সেই খবর পৌঁছে দেয়।

তথ্যসূত্র: মাসকাট ডেইলি, আরাবিয়া ওয়েদার

অবাক হলেও সত্যি, এ আটটি প্রাণী বাস করে আগ্নেয়গিরির পাশে

Read full story at source