অপ্রস্তুত মুহূর্তই এখন ‘কনটেন্ট’, ভিউয়ের দৌড়ে ভাঙছে নারীর গোপনীয়তা

· Prothom Alo

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনের পাশে একটি অনুষ্ঠানে হঠাৎ ধরা পড়ে ভিন্ন এক দৃশ্য। এক ব্যক্তি দূর থেকে মুঠোফোনে জুম করে দুই তরুণ-তরুণীর ভিডিও করছেন। ওই তরুণ–তরুণী নিজেদের মতো করে ব্যক্তিগত ছবি তুলছিলেন। ভিডিওটি পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। গোপনে ভিডিও করা ওই ব্যক্তি একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের সাংবাদিক। জনপরিসরে সম্মতি ছাড়া এমন ভিডিও ধারণ ও প্রচার নিয়ে শুরু হয়েছে সমালোচনা।

শুধু এই তরুণ–তরুণীর ভিডিও নয়, সম্মতি ছাড়া ধারণ করা এমন অসংখ্য ছবি-ভিডিওই ছড়িয়ে আছে অনলাইনে, সেগুলো লাখ লাখ বার দেখাও হচ্ছে, যার মধ্য দিয়ে প্রোফাইলগুলোর আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

Visit extonnews.click for more information.

সম্প্রতি একজন নারী উদ্বেগে ওড়না হাতের মুঠোয় নিয়ে মুখে চেপে ধরেছেন—এমন একটি ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ভিন্ন ক্যাপশন দিয়ে। তাতে লেখা হয়, ‘বর্তমান মেয়েরা…কাপড় দিয়ে মুখ ডাকে (ঢাকে)’।

ওই পোস্টে একজন প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করে মন্তব্যে লেখেন, এই নারী সঙ্গে থাকা তাঁর শিশুসন্তানকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে খোঁজাখুঁজি করছিলেন। ওই সময় গোপনে তা ভিডিও করে এমন এমন ক্যাপশন দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।

এ ছাড়া সম্প্রতি মেট্রোরেলে ভিড়ের মধ্যে জড়িয়ে ধরে থাকা এক যুগল এবং পয়লা বৈশাখে আড়ালে বসে ধূমপান করা দুই তরুণীর ছবি দূর থেকে ধারণ করে ইঙ্গিতপূর্ণ ক্যাপশন দিয়ে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

তথ্য ব্যবস্থায় প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এটি ‘ভয়্যারিজম’। অন্যের অজান্তে ব্যক্তিগত মুহূর্ত দেখার মাধ্যমে আনন্দ পাওয়া বা ভয়্যারিজম একধরনের বিকৃতি।

অপ্রস্তুত মুহূর্তই ‘কনটেন্ট’

নারীদের অপ্রস্তুত মুহূর্তের ভিডিও এবং ছবি ফেসবুকে পোস্ট করা হয়েছে, এমন ৩৭টি পেজ ও ব্যক্তিগত প্রোফাইল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নারীদের অজান্তে ধারণ করা ভিডিও সেখানে নিয়মিত পোস্ট করা হচ্ছে। বেশির ভাগ ভিডিওতেই রয়েছে বাড়ির ছাদ বা উঁচু স্থান থেকে নিচে অবস্থান করা নারীদের ধারণ করা, দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত বা চলাচলের পথে নারীরা অপ্রস্তুত অবস্থার দৃশ্য। এসব পোস্টে অনেক মন্তব্যকারীর ভাষাও অশালীন।

ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, অনেকে এ ধরনের ভিডিও দেখতে চায়। বিকৃতিকে পুঁজি করে কিছু পেজে ও ব্যক্তিগত প্রোফাইলে এমন ভিডিও ও ছবি প্রকাশ করে ক্লিকবেইট কৌশলে আয় বাড়ানো হয়। এভাবে ব্যক্তির ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা হচ্ছে এবং ভুক্তভোগীকে সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে।

ফেসবুকে বিভিন্ন প্রোফাইল থেকে নারীদের অসতর্ক মুহূর্তের ভিডিও গোপনে ধারণ করে তা প্রকাশ করা হচ্ছে। এসব প্রোফাইলের কোনো কোনোটির অনুসারী কয়েক লাখ। ভিডিওগুলোর ভিউ লাখ থেকে মিলিয়নও ছাড়াচ্ছে।

অশালীন ক্যাপশনে প্রকাশ

ফেসবুকে একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল (প্রফেশনাল মোড চালু) শনাক্ত করা গেছে, যা পেজের মতো ব্যবহার করে নিয়মিত কনটেন্ট প্রচার করা হচ্ছে। প্রোফাইলটিতে প্রায় ৪৮ হাজার অনুসারী (ফলোয়ার) আছে। এই প্রোফাইলে নারীদের অসতর্ক মুহূর্তের ভিডিও অশালীন ক্যাপশন দিয়ে নিয়মিত পোস্ট করা হয়।

একজন নারী কল থেকে পানি নিচ্ছেন, পেছন থেকে জুম করে ওই নারীর ছবি নেওয়া হয়েছে। কেউ বসে চুলায় কাজ করছেন—সেই স্থিরচিত্র প্রকাশ করা হয়েছে প্রোফাইলটিতে। ‘ভাবি’ উল্লেখ করে কোনো কোনো নারীর ছবিতে অশালীন ক্যাপশন দেওয়া হয়েছে।

এমন অশালীন ও ইঙ্গিতপূর্ণ ক্যাপশনে ভিডিও দেখার হারও বেশি হতে দেখা গেছে। অশালীন ক্যাপশনের একটি ভিডিও প্রায় সাত লাখ বার দেখা হয়েছে। কোনো কোনো কনটেন্টের ভিউ মিলিয়নও (১০ লাখ) ছাড়িয়েছে।

রেস্টুরেন্টে বসে থাকা নারীদের গোপনে ভিডিও করা হয়েছে

ফেসবুকে আরেকটি ব্যক্তিগত প্রোফাইলের অনুসারী প্রায় ৭৯ হাজার। এই প্রোফাইলে উল্লেখ করা হয়েছে, এটি মোটরবাইক, খাবার, ভ্রমণ ও ট্যুর-সংক্রান্ত কনটেন্ট প্রচারের পেজ/প্ল্যাটফর্ম। তবে এসবের বাইরে নারীদের কেন্দ্র করে বিভিন্ন ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। এসব রিল বা ভিডিওতে ইঙ্গিতপূর্ণ ক্যাপশন দিয়ে বাড়ানো হচ্ছে এনগেজমেন্ট।

ফেসবুকে একটি পেজকে ‘প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদন ক্লাব’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১১ হাজার অনুসারীর এই পেজে ‘এ রকম ভিডিও পেতে হলে সাথে থাকতে হবে’ কিংবা ‘পার্ট টু আসতেছে’ শিরোনামের ইঙ্গিতপূর্ণ কিছু ক্যাপশনের ভিডিও পোস্ট দেখা যায়। গোপন ধারণ করা ভিডিওগুলোয় রেস্টুরেন্ট নামে পার্ট ১ ও ২ নামে একাধিক পোস্ট রয়েছে। এ ছাড়া পার্কে, সিনেমা হলের ভেতরে নারী-পুরুষের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে প্রচার করতে দেখা গেছে।

মিরাজ আহমেদ চৌধুরী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডিজিটালি রাইটঅনেকে এ ধরনের ভিডিও দেখতে চায়। বিকৃতিকে পুঁজি করে কিছু পেজে ও ব্যক্তিগত প্রোফাইলে এমন ভয়্যারিস্টিক ভিডিও ও ছবি প্রকাশ করে ক্লিকবেইট কৌশলে আয় বাড়ানো হয়। এভাবে ব্যক্তির ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা হচ্ছে এবং ভুক্তভোগীকে সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে।

লাখো অনুসারী, মিলিয়ন ভিউ

ইংরেজি অক্ষরে নাম লেখা একটি ফেসবুক পেজের শ্রেণি বিভাগে উল্লেখ করা হয়েছে ‘আর্ট ও হিউম্যানিটিজ ওয়েবসাইট’। কিন্তু সেখানে বেশির ভাগ ভিডিও রেস্টুরেন্টে বা পার্কে বসে থাকা ও রাস্তায় হাঁটতে থাকা নারীদের বারবার জুম ইন ও জুম আউট করে ধারণ করা। দূর থেকে ধারণ করা বিভিন্ন যুগলের ভিডিও রয়েছে।

এই পেজ থেকে কক্সবাজার সৈকতে ধারণ করা একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে, যেখানে কিশোরীও রয়েছে। ঢেউয়ের পানিতে ভিজে আনন্দ করছে এমন ভিডিও ইঙ্গিতপূর্ণ ফ্রেমিংয়ের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে। ভিডিওর নেপথ্যে ভাইরাল গান সংযুক্ত করা হয়েছে। এই ভিডিওর ভিউ মিলিয়ন হয়ে গেছে।

এই পেজের অন্যান্য রিলে দেখা গেছে, নববর্ষের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিনোদনকেন্দ্র বা পর্যটনস্থলে অবস্থান করা নারীদের বিভিন্ন অপ্রস্তুত মুহূর্ত ধারণ করে প্রচার করা হয়েছে। এসব ভিডিওর সঙ্গে ভাইরাল গানের পাশাপাশি ক্যাপশনে ইঙ্গিতপূর্ণ ‘ও ভাই ওই তো পুরা আগুন, ওই তো এলাকার তাপমাত্রা বাড়াইয়া দিছে কি? ডিস্টিং ডিস্টিং’ সংলাপ যুক্ত করা হয়েছে। যেগুলোর ভিউ কয়েক লাখ থেকে মিলিয়ন পর্যন্ত।

এই ভিডিওর ভিউ ১০ লাখ ছাড়িয়েছে

কিছু পেজ আবার সচেতনতার নামে গোপনে পার্কে অবস্থান করা ছেলেমেয়ের ভিডিও ধারণ করে পোস্ট করেছে। ১৯ লাখ অনুসারীর একটি ফেসবুক পেজ মূলত নারীদের বাইক চালানোবিষয়ক কনটেন্ট প্রকাশ করে। কিন্তু দুটি ছেলেমেয়ের ৪৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করে অভিভাবকদের সতর্ক করা হয়েছে। ভিডিওটি ১৫ এপ্রিলের বলে উল্লেখ করা হয়। ভিডিওটি এখন পর্যন্ত ৩৭ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে, প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার প্রতিক্রিয়া, প্রায় সাড়ে ৭ হাজার মন্তব্য ও দেড় হাজারের বেশি শেয়ার হয়েছে।

ইংরেজি অক্ষরে নাম লেখা একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইলে অনুসারীর সংখ্যা ৪ হাজার। সেখানে গোপনে ধারণ করা অশালীন ক্যাপশনযুক্ত ২৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ৬৫ হাজার বার দেখা হয়েছে। নারী-পুরুষের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের একই ধরনের আরেকটি ভিডিও দেখা হয়েছে ৭০ হাজারের বেশি বার। ইংরেজি অক্ষরে নাম লেখা আরেকটি ফেসবুক পেজ থেকে একই ধরনের ভিডিওর ভিউ হয়েছে ৭৮ হাজার।

এই প্রোফাইল ও পেজগুলোর তথ্য প্রথম আলোর কাছে থাকলেও সম্পাদকীয় নীতিমালা অনুসরণ করে তা প্রকাশ করা হয়নি।

সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬–এর ২৫ ধারায় যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং বা অশ্লীল বিষয়বস্তু প্রকাশ–সংক্রান্ত অপরাধ ও দণ্ডের উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে। ভুক্তভোগীর বয়স ১৮ বছরের নিচে হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির শাস্তির মাত্রা বেশি হবে। এ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে।

ভিডিও ধারণ ও প্রচারকারীদের বক্তব্য

প্রতিবেদনের শুরুতে যে যুগলের ভিডিও করার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, সে ঘটনায় অভিযোগটি আবুল কালাম নামের এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে। তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারী। গত বছর একটি অনলাইন পোর্টালে যোগ দিয়েছেন।

আবুল কালাম প্রথম আলোকে বলেন, তিনি কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে ভিডিও করেননি। অনুষ্ঠানে বসে থাকার সময় তরুণ-তরুণীর রোমান্টিক আচরণ দেখে তাঁর ভালো লেগেছিল, সুন্দর দৃশ্য হিসেবে সেটা তিনি ভিডিও করছিলেন। সেই ভিডিও তিনি কোথাও পোস্ট করেননি। তাঁর দাবি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁকে খারাপ মানসিকতার মানুষ হিসেবে ফেসবুকে প্রচার করা হচ্ছে। এ ঘটনায় তাঁর প্রতিষ্ঠানের কোনো সম্পৃক্ততা না থাকলেও প্রতিষ্ঠানকেও হেয় করা হচ্ছে।

ভিডিও করার সময় আপনি হাসছিলেন—এমন কথার জবাবে তিনি বলেন, ‘দৃশ্যটা ভালো লাগছিল বলে হাসছিলাম। সেখানে উপস্থিত অন্যরাও হাসছিল।’

এ ছাড়া আরও ১৫টি ফেসবুক প্রোফাইল ও পেজে বার্তা পাঠায় প্রথম আলো। এর মধ্যে শুধু একটি পেজের অ্যাডমিন সাড়া দিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ভাইরাল ইস্যুতে তাঁরা নিয়মিত কনটেন্ট প্রকাশ করেন। তবে ভিডিও প্রচারে সংশ্লিষ্টদের অনুমতি নেওয়া হয় না, কেউ আপত্তি জানালে মুছে দেবেন।

নারীদের গোপন ও অপ্রস্তুত অবস্থার ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘শুধু আমরা না, অনেক বড় বড় পেজ ও প্রোফাইলেও এ ধরনের ভিডিও পোস্ট করা হচ্ছে। সেগুলো দেখেই আমরাও ভাইরাল ইস্যুগুলো শেয়ার করছি।’

সম্মতি ছাড়া ধারণ করা এমন অসংখ্য ছবি-ভিডিওই এখন হয়ে উঠছে অনলাইনে ভিউ আর আয়ের উৎস

আইনে কী আছে

সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬–এর ২৫ ধারায় যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং বা অশ্লীল বিষয়বস্তু প্রকাশ–সংক্রান্ত অপরাধ ও দণ্ডের উল্লেখ করা হয়েছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে অন্য কোনো ব্যক্তিকে ব্ল্যাকমেইলিং বা যৌন হয়রানি বা রিভেঞ্জ পর্ন বা ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়ন–সংক্রান্ত উপাদান বা সেক্সটর্শন করার উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত কোনো তথ্য, ভিডিও চিত্র, অডিও ভিজ্যুয়াল চিত্র, স্থিরচিত্র, গ্রাফিকস বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নির্মিত বা এডিট করা তথ্য উপাত্ত প্রচার করেন, যা ক্ষতিকর বা ভীতি প্রদর্শক, তাহলে কাজটি হবে অপরাধ।

এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। ভুক্তভোগীর বয়স ১৮ বছরের নিচে হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির শাস্তির মাত্রা বেশি হবে। এ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে।

মনীষা বিশ্বাস, ফোকাল পারসন, সিএসডব্লিউসি প্ল্যাটফর্ম, ব্লাস্টসামাজিক বাধার কারণে অনেক নারী ও তাঁদের পরিবার অভিযোগ করতে আগ্রহী হন না। অনেক ভিডিও গোপনে ধারণ করা হয় এবং ভুক্তভোগীরা সেগুলো প্রচার হচ্ছে—এটাও জানেন না। তাই অভিযোগও আসে না আর এই সুযোগ নেয় অপরাধীরা।

অপরাধ বেশি, অভিযোগ কম

ফেসবুকের কতটি পেজে কতটি অশালীন ভিডিও, ছবি, কনটেন্ট প্রচার করা হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া কঠিন। তবে গত ২ মার্চ প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি গোলটেবিল বৈঠকে পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) তাপতুন নাসরীন বলেন, গত পাঁচ বছরে নারীর প্রতি অনলাইন সহিংসতা নিয়ে পুলিশের কাছে ৮৭ হাজার ৭২৭টি অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৫২ হাজার ৭০২টি অভিযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আর মাত্র ১৮০টি মামলা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমন আহমেদ শাওন প্রথম আলোকে বলেন, হয়রানির শিকার নারীদের বেশির ভাগই আইনি প্রক্রিয়ায় আসেন না। তবে ভুক্তভোগী বা তাঁদের অভিভাবক অভিযোগ করলে পুলিশ ব্যবস্থা নিতে পারে। কনটেন্ট অপসারণে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে অনুরোধ পাঠানোর পাশাপাশি পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।

এই পুলিশ কর্মকর্তা পুলিশের সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের হটলাইন নম্বর (০১৩২০০০০৮৮৮), ফেসবুক পেজ (Police Cyber Support for Women–PCSW) ও ইমেইল ([email protected]) ব্যবহার করে সহিংসতার শিকার নারীদের অভিযোগ জানানোর পরামর্শ দিয়েছেন।

অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান

১৩ এপ্রিল প্রথম আলো কার্যালয়ে আরেকটি গোলটেবিল বৈঠকে বিটিআরসির মহাপরিচালক (প্রশাসন) ও যুগ্ম সচিব মো. মেহেদী-উল-সহিদ বলেন, গত বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট অপসারণ নিয়ে ১৩ হাজার ২৩টি অভিযোগ পেয়েছে বিটিআরসি। এর মধ্যে ১২ হাজারের বেশি কনটেন্ট সরানো হয়েছে। অভিযোগকারীদের ৯০ শতাংশই নারী।

এক ভুক্তভোগীর মামলার পর ২০২৩ সালের মে মাসে ‘পমপম’ নামে টেলিগ্রামভিত্তিক একটি চক্রের নয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। চক্রটি তরুণী ও কিশোরীদের ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও বিক্রি করত এবং ফেসবুক–ইনস্টাগ্রাম আইডি হ্যাক করে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায় করত। টাকা না দিলে ভিডিও কলে আপত্তিকর দৃশ্য তৈরি করতে বাধ্য করা হতো।

ভুক্তভোগীরা পুলিশের সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের হটলাইন নম্বর (০১৩২০০০০৮৮৮), ফেসবুক পেজ (Police Cyber Support for Women-PCSW) ও ই–মেইল ([email protected]) ব্যবহার করে অভিযোগ জানাতে পারেন।

মাসিক সাবস্ক্রিপশন ফি দিয়ে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশের সদস্যরা এতে যুক্ত হতো। তারা অল্পবয়সী মেয়েদের গোপন ব্যক্তিগত ভিডিও কিনে নিত। গ্রুপের হোতা চট্টগ্রামের আবু সায়েম নিজেকে ‘মার্ক জাকারবার্গ’ বলে পরিচয় দিতেন। তাঁর একাধিক ব্যাংক হিসাবে কোটি টাকার লেনদেনের তথ্যও পায় সিআইডি।

অলংকরণ: আরাফাত করিম

এই প্রবণতা থামবে কীভাবে

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন (সিএসডব্লিউসি) প্ল্যাটফর্মের ফোকাল পারসন মনীষা বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, সামাজিক বাধার কারণে অনেক নারী ও তাঁদের পরিবার অভিযোগ করতে আগ্রহী হন না। অনেকে আবার তাদের ভিডিও গোপনে ধারণ ও প্রচারের বিষয়টি জানেনও না। তাই অভিযোগও আসে না, আর এই সুযোগ নেয় অপরাধীরা।

মনীষা বিশ্বাস আরও বলেন, আদালত যদি স্বতঃপ্রণোদিতভাবে পুলিশকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন, তাহলে এ ধরনের অপরাধ কমতে পারে।

‘টেলিগ্রামে হাজারো তরুণীর নগ্ন ভিডিও বিক্রি’ শিরোনামে দৈনিক মানবজমিনে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৯ অক্টোবর স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আদেশ দেন আদালত। ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন টেলিগ্রামের পর্নোগ্রাফি-সংক্রান্ত গ্রুপ, অ্যাডমিন ও অর্থ লেনদেনকারীদের শনাক্ত করে মামলা করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপপুলিশ কমিশনারকে একজন দক্ষ তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়।

সুমন আহমেদ শাওন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, পুলিশ সদর দপ্তরহয়রানির শিকার নারীদের বেশির ভাগই আইনি প্রক্রিয়ায় আসেন না। তবে ভুক্তভোগী বা তাঁদের অভিভাবক অভিযোগ করলে পুলিশ ব্যবস্থা নিতে পারে।

আদালতের এই আদেশের পরও অগ্রগতি দেখা যায়নি, বলেন আইনজীবী মনীষা বিশ্বাস।

এই বিকৃত চর্চার জন্য সমাজে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার শূন্যতাকেও দায়ী করছেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এই শূন্যতার স্থানটি দখল করছে ডিজিটাল জগৎ। এতে নানা বিকৃতি বাড়ছে, বিশেষ করে নারীদের অজান্তে ব্যক্তিগত মুহূর্ত প্রকাশ করা।

এই নারীনেত্রী বলেন, ক্ষতিকর কৌতূহল ও কৌতুক থেকে বিরত থাকা জরুরি। পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীর মর্যাদা ও মূল্যবোধ শেখানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

Read full story at source