রাবণের দেশে, ঘুরে এসে

· Prothom Alo

শ্রীলঙ্কার পথে পথে ঘুরে যেন এক ভিন্ন জগতের দরজা খুলে যায়—শহরের কোলাহল, পাহাড়ের নীরবতা আর মানুষের উষ্ণতায় উজ্জ্বল এক জীবন্ত অনুভূতির ক্যানভাস। কলম্বো থেকে ক্যান্ডি হয়ে এল্লার সবুজে মোড়া পথে প্রতিটি মুহূর্তই ছিল নতুন আবিষ্কার। কখনো মুগ্ধতা, কখনো বিষণ্নতা—সব মিলিয়ে এই ভ্রমণ হয়ে ওঠে হৃদয়ে থেকে যাওয়ার মতো এক অনির্বচনীয় গল্প।

Visit biznow.biz for more information.

আগের লেখায় সিংহল সমুদ্র নিয়ে বলেছি কেবল। এবার আসি বাকি বৃন্তান্তে। এই লেখায় সমুদ্রের জলের ছিটেফোঁটা অবধি নেই। আছে শুধু শহর আর পাহাড়। যদিও সিংহলের রাজধানী অনুরাধাপুরায় যাওয়াটা হলো না, তবু শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে যাওয়াটা মিস হয়নি। আগেই বলেছি, বাবার কাজের সূত্রে ঘুরতে যাওয়া। কাজেই শহরে যেতেই হতো। মাতারা থেকে দূরপাল্লার বাস ধরে কলম্বোর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। অরুন্ধতী রায়ের ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ পড়ার পর থেকেই কেরালা যাওয়ার খুব ইচ্ছা আমার। সবুজে ঘেরা একটা জায়গা।

কলম্বোর বিখ্যাত লোটাস টাওয়ার

মাতারা থেকে কলম্বো যাওয়ার রাস্তাটা ঠিক যেন কেরালার মতো। দুই পাশ দিয়ে সারি সারি গাছ। শ্রীলঙ্কায় ঘুরতে গিয়ে আমার বেশ কয়েকবারই মনে হয়েছে যেন দক্ষিণ ভারতে ঘুরতে এসে পড়েছি। কলম্বো শহরে উল্লেখ করার মতো ঘোরার বর্ণনা তেমন নেই। একদিন ওদের জনপ্রিয় পেট্টা মার্কেট দেখতে গেলাম। ঠিক যেন আমাদের চকবাজার। একটা বেশ পুরোনো মসজিদও আছে। মসজিদে মেয়েদের নামাজের ব্যবস্থাও আছে। নামাজ পড়ে বেরোতেই মনে হলো, পুরোদস্তুর চকবাজারে ঢুকে পড়েছি। আশপাশে ইফতারের আয়োজনও চলছিল।

দীর্ঘ পথ বাসে এসে ভীষণই ক্লান্ত লাগছিল সেদিন। তাই অল্প কিছু কেনাকাটা করে হোমস্টেতে ফেরত চলে এলাম। পরের দিন অবশ্য আমি আর মা মিলে বেশ ঘুরেছি। একটা বৌদ্ধমন্দির দেখতে যাই। রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার পথে হ্যান্ডমেইড গয়নার দোকান দেখে চটজলদি ঢুকে পড়ি। কর্ণধার ভদ্রমহিলার নাম হিমানী। সুন্দর সব গয়না তিনি নিজে হাতে বানিয়েছেন। যখন শুনলেন আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি, চা অফার করলেন। বললেন, ‘আমরা যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম, তোমরা খুব সাহায্য করেছ। মানুষ বিপদের দিনের বন্ধুর কথা কখনোই ভুলতে পারে না। তোমাদের ধন্যবাদ।’ কলম্বোতে কাজের পাট চুকিয়ে এবার গন্তব্য ছিল ক্যান্ডি।

এই মন্দিরেই আছে বুদ্ধের দাঁত

ক্যান্ডি নিয়ে আমার অনেক কিছুই বলার আছে। শ্রীলঙ্কা যাওয়ার আগে আমি সবার মুখে শুনেছি, এল্লা দেশটির সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। কিন্তু আমার বারবারই মনে হয়েছে ক্যান্ডি খুব সুন্দর। যে রিসোর্টে ছিলাম, তার নাম ‘ক্যান্ডি ভিউ রিসোর্ট’। জানালা দিয়ে পুরো শহরের অপার্থিব পাহাড়ি সৌন্দর্য দেখা যায়। অবশ্য উঠতে–নামতে খুবই কষ্ট হতো। প্রথম দিন গেলাম বুদ্ধের দাঁত যেখানে রাখা আছে, সেই মন্দিরে। এটা ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। কাজেই প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে টিকিট কেটে আমি আর আমার ভাই ঢুকে পড়ি। ভেতরটায় প্রায় অনেক জায়গাতেই ছবি তোলা মানা। তবে দেখতে এত ভালো লাগছিল সবকিছু!

এরপর পালা ক্যান্ডি শহর ঘোরার। ক্যান্ডি মুখোশ ও কাঠের কাজের জন্য বিখ্যাত। বাবা-মাকে হোটেলে পাঠিয়ে দিয়ে আমি আর ভাই শহর ঘুরতে বের হই। এ শহরে সমুদ্র নেই। তবে একটা লেক দিয়ে পুরো শহর ঘেরা। লেকের জলে আবার মাছেরও চাষ হয়! অনেকেই মাছেদের খাবার দেন। লেক ঘুরে আমরা কাঠের হ্যান্ডিক্র্যাফটসের দোকান। খুঁজতে খুঁজতে বেশ কিছু দোকান ঘুরে ফেলি। ঘণ্টা তিনেকের ঘোরা শেষে হোটেলে ফিরে আসি। ক্যান্ডির রাস্তায় হাঁটতে বেশ ভালো লাগছিল। ছোট্ট ছিমছাম একটা শহর। পরের দিন ঈদ। মুসলমানরা শ্রীলঙ্কায় সংখ্যালঘু। কাজেই ঈদের আমেজ তেমন নেই। সকাল সকাল সেজেগুজে রাস্তায় বেরিয়ে দেখি, সবাই যার যার মতো কাজে যাচ্ছে। মিথ্যে বলব না, আমার বেশ মন খারাপ হয়েছিল। বারবারই মনে হচ্ছিল, সবাই দেশে কত মজা করছে একসঙ্গে!

ক্যান্ডি লেক

ঈদের দিন সকালে কিছু খেয়েই আমরা রওনা হলাম নুয়েরা এলিয়ার পথে। রেন্ট-এ-কারে একখানা গাড়ি নিয়েছি। ড্রাইভারের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে ঘুরিয়ে দেখানোর। তবে একটা মসলার বাগান আর ঝরনা দেখতে গিয়েই বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। ঝরনা অবধি পাহাড়ি রাস্তা ডিঙিয়ে উঠতে–নামতে হাত-পা কেটে নাজেহাল দশা। তবে ঝরনার সামনে দাঁড়িয়ে এত ভালো লাগল যে সব ক্লান্তি মুছে গেল।

এরপর গাড়িতে করে নুয়েরা এলিয়া গিয়ে কেবল গ্রেগরি লেকটাই দেখতে পেলাম। মাঝে একটা চা-বাগানও দেখেছি। তবে আমার আনন্দের সীমা ছাড়াল তখন, যখন পথে হুট করেই সীতামাতার মন্দির পড়ে গেল। কথিত আছে, রাবণ প্রথম সীতাকে এখানে এনে আটকে রাখে। পরে সীতামাতার স্মরণে এখানে মন্দির স্থাপিত হয়। জায়গাটার নামও সীতা এলিয়া।

সীতামাতার মন্দিরের সামনে লেখক

নুয়েরা এলিয়াতে রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা ছিল না। আমরা গাড়ি নিয়ে চলে যাই এল্লায়। বেশ রাত হয়ে যায়। শ্রীলঙ্কায় এত দিন রাত আটটা বাজতে না বাজতেই পিনপতন নীরবতা দেখেছি। তবে এল্লায় এসে একেবারেই ভিন্ন চিত্র দেখলাম। এখানকার রাতের শহর খুবই জীবন্ত। ফুর্তি আর মজায় ভরা। নাইট লাইফ আর পার্টিতে অভ্যস্ত নই, কাজেই আমরা চলে গেলাম পাহাড়ের ওপরে আমাদের ছোট্ট বাড়ি ‘রাভানা রক হোমস্টে’তে। এই দেশে সব হোমস্টেই আমার ভালো লেগেছে। তবে এই ছোট্ট হোমস্টের কথা আমার মনে থেকে যাবে। দুই সন্তান ও একটি কুকুর নিয়ে এই দম্পতির ছোট্ট পরিবার। ফুল, গাছপালায় ঘেরা বাড়ি। পাশ দিয়ে বয়ে চলছে ঝরনার জল।

দেশটির খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে বেশ অস্বস্তিতে ছিলাম। এই হোমস্টের খাবার এত মজা! সব আপত্তি ঘুচে গেল। পরের দিন সকালের গন্তব্য নাইন আর্চেস ব্রিজ। এল্লার জনপ্রিয় ট্রেনের লাইন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

শাকাহারি বুফের খাবার

সরাসরি ট্রেনে যাওয়ার উপায় নেই। টিকিটও পাইনি। তাই ঠিক সাড়ে ১১টায় ব্রিজের ওপর দিয়ে ট্রেন যাবে, তাই দেখতে তড়িঘড়ি করে ছুটলাম। এরপর আরেকটা ঝরনা ও লিটল অ্যাডামস পিক নামে পাহাড় দেখে খিদে পেয়ে গেল। টুকটুকের ড্রাইভার আমাদের স্থানীয় এক হোটেলে নিয়ে গেলেন, যেখানে শাকাহারী বুফে বসেছিল! তৃপ্তি করে খেলাম।

রাভানা ফলস নামের যে ঝরনার জন্য সবাই পাগল, সেখানের ভিড় দেখে বিরক্তই হলাম। সন্ধে নামার আগেই পাহাড়ের ওপরে হোমস্টেতে ফিরে বারান্দায় বসে দূর থেকে পাহাড় দেখছিলাম। পরের দিনই ফেরা। ফেরার সময় রাভানা রক হোমস্টের ভদ্রমহিলা দুটি ফুল তুলে হাতে দিলেন।

সেই বিখ্যাত নাইন আর্চেস ব্রিজ আর্চেস ব্রিজ

কারণ, আমি একবার বলেছিলাম, তোমাদের এই ফুলগুলোর রং কী সুন্দর! ফেরার দিন মন খারাপ করছিলেন বেশ। বলাই বাহুল্য নয়, শ্রীলঙ্কার মানুষেরা বেশ অতিথিপরায়ণ। টুকটুক অনেকটা সামনে চলে গেলেও মিররে দেখতে পাই, রাভানা রকের মালিক সঙ্গে কুকুর মিকিকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। যেন তাঁরা বলছেন, ‘এই রাবণের দেশকে মনে রেখো কিন্তু!’

ছবি: লেখক

Read full story at source