রোহিঙ্গারা কেন নিজ দেশে ফিরতে পারল না

· Prothom Alo

এ এক অনিরসিত প্রশ্নের অন্তরালের ইতিহাস, রাজনীতি ও নীতিগত ব্যর্থতা। প্রশ্নটি যতটা পুরোনো, ততটা অমীমাংসিত। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী জনগোষ্ঠী, রোহিঙ্গারা, কেন আজও নিজেদের ভূখণ্ডে ফিরে যেতে পারল না? যে সংকটকে আমরা মানবিক বিপর্যয় বলে জানি, তার গভীরে আছে ইতিহাসের বিশ্বাসঘাতকতা, রাষ্ট্রীয় বর্জন এবং সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক কৌশল ও কূটনৈতিক ব্যর্থতার এক জটিল সমীকরণ। বিস্ময়কর হলেও সত্য, এই সংকটের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরতে হয় ঔপনিবেশিক অতীতের দিকে—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা রাখাইন অঞ্চলের মুসলিম রোহিঙ্গাদের আশ্বাস দিয়েছিল—যদি তারা ব্রিটিশদের পক্ষে অবস্থান নেয়, তবে যুদ্ধোত্তর সময়ে তাদের জন্য স্বায়ত্তশাসনের ব্যবস্থা করা হবে। রোহিঙ্গারা সেই প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রেখেছিল। কিন্তু যুদ্ধশেষে ব্রিটিশরা সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। ফলে নতুন রাষ্ট্র মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা হয়ে পড়ে রাষ্ট্রহীন, পরিচয়হীন—এক প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই অধ্যায়ে জাপানের ভূমিকাও বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। ১৯৪২ সালে জাপানি বাহিনী বার্মায় প্রবেশ করলে আরাকান অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য ভেঙে পড়ে, এবং সেই শূন্যতায় রোহিঙ্গা মুসলমান ও রাখাইন বৌদ্ধদের মধ্যে ভয়াবহ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। জাপানি আগ্রাসন কেবল সামরিক দখলই ছিল না; তা স্থানীয় জাতিগত বিভাজনকে আরও উসকে দেয় এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তাহীনতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। ইতিহাসের নির্মম ব্যঙ্গ হলো, যুদ্ধকালে জাপানের উপস্থিতি যেমন ব্যবসায়িক-সামরিক স্বার্থকে মানবিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে রেখেছিল, সমকালেও মিয়ানমার প্রশ্নে টোকিওর অবস্থান প্রায়ই সেই পুরোনো ধারা মনে করিয়ে দেয়—যেখানে নৈতিক স্পষ্টতার চেয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বিনিয়োগ ও কৌশলগত স্বার্থ বেশি প্রাধান্য পায়।

Visit freshyourfeel.org for more information.

এটিও কম বিস্ময়কর নয় যে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের সমাজে সম্পূর্ণভাবে বহিষ্কৃত ছিল না। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে তারা সংসদ সদস্য ছিল, প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ ছিল, এমনকি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমেও তাদের উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান। অর্থাৎ তারা কেবল অসহনশীলতার শিকার নয়, বরং একসময় ছিল রাষ্ট্রের অংশীদার। কিন্তু ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন তাদের সেই অবস্থান চূড়ান্তভাবে কেড়ে নেয়—তাদের আইনি কাঠামোর বাইরে ঠেলে দেয়।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনটি কেবল একটি আইনি সংশোধন ছিল না; রোহিঙ্গাদের বাস্তব জীবনে এটি ছিল এক প্রাতিষ্ঠানিক নির্বাসনের সূচনা। এই আইনের ফলে তারা নাগরিকের মর্যাদা হারায়, অবাধ চলাচল, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, জমির অধিকার, বিবাহের অনুমতি—সব ক্ষেত্রেই কঠোর বিধিনিষেধের মুখে পড়ে। অর্থাৎ সংবিধানিক ও আইনি কাঠামো থেকে তাদের বাদ দেওয়া মানে ছিল রাষ্ট্রের চোখে তাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। তারা নিজ জন্মভূমিতেই হয়ে ওঠে ‘অন্তর্গত বহিরাগত’—দেশের ভেতরে থেকেও দেশের বাইরে। পরে যে সহিংসতা, দমন, গণহত্যার পরিবেশ এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি আমরা দেখি, তার সামাজিক-প্রশাসনিক ভিত্তি অনেকটাই তৈরি হয় এই আইনি বর্জনের মধ্য দিয়ে।

রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয়ের ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর প্রথম দফায় তারা বাংলাদেশে আসে। ১৯৭৭ সালে ‘নাগা মিন’ (ড্রাগন কিং) অভিযানের সময় প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯১-৯২ সালে আবারও প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা নিপীড়ন থেকে বাঁচতে পালিয়ে আসে বাংলাদেশে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এই দুটি বড় ঢেউয়ের পর বাংলাদেশ সরকার সফলভাবে তাদের একটি বড় অংশকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হয়েছিল। বিশেষ করে ১৯৯২-৯৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকারের অধীনে জাতিসংঘের সহায়তায় প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। অর্থাৎ রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা থাকলে প্রত্যাবাসন অসম্ভব ছিল না—ইতিহাস তা প্রমাণ করে।

২০১৭ কেন ব্যতিক্রম?

কিন্তু ২০১৭ সালের পর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রায় সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা একযোগে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এই বিপুল সংখ্যার পরও কেন তাদের প্রত্যাবাসন সম্ভব হলো না—এটাই মূল প্রশ্ন। ২০১৭ সালের সহিংসতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—মিয়ানমার রাষ্ট্র অত্যাচারের বাস্তবতাকে আড়াল করতে সচেষ্ট ছিল, আর আন্তর্জাতিক পরিসরে সেই আড়াল তৈরিতে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বও ভূমিকা রাখে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও গ্রাম ধ্বংসের অভিযোগকে নিয়মিতভাবে অস্বীকার বা খাটো করে দেখায়। আরও বেদনাদায়ক হলো, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতীক হিসেবে একসময় বিশ্বে সম্মানিত অং সান সু চিও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দাঁড়িয়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগকে ‘অসম্পূর্ণ’ ও ‘ভ্রান্ত ধারণানির্ভর’ বলে প্রতিরক্ষা দেন। ফলে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নৃশংসতার সত্য শুধু মাঠপর্যায়ে নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষাতেও চাপা পড়ার চেষ্টা করা হয়।

প্রথমত, এই মানবিক সংকটকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে মানবিক নেত্রী হিসেবে উপস্থাপন করতে এই সংকটকে ব্যবহার করেছেন। এতে সমস্যার দীর্ঘায়ন রাজনৈতিকভাবে ‘লাভজনক’ হয়ে ওঠে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষিত হয়।

দ্বিতীয়ত, নীতিগত এক গুরুতর ভুল ছিল রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর। আন্তর্জাতিক শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় একটি মৌলিক নীতি হলো—শরণার্থীদের উৎস দেশের সীমান্তের নিকটবর্তী রাখা, যাতে পরিস্থিতি অনুকূল হলে দ্রুত প্রত্যাবর্তন সম্ভব হয়। ভাসানচরে স্থানান্তরের মাধ্যমে সেই সম্ভাবনাকে আরও দুর্বল করা হয়েছে।

তৃতীয়ত, দীর্ঘ সময় ধরে একটি দেশে অবস্থান করলে শরণার্থীদের মধ্যে ধীরে ধীরে স্থায়ী হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এটি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যাবাসনের আগ্রহ কমে যায়—যা এ ক্ষেত্রেও ঘটেছে।

সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল দৃশ্যমান ও কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতার অভাব। মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন নিয়ে যে ধরনের চাপ প্রয়োগ প্রয়োজন ছিল, তা দেখা যায়নি। বরং ভারতসহ কিছু দেশের ওপর নির্ভরতা দেখা গেছে, যেখানে ভারত নিজেই তার ভূখণ্ড থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে—যা একধরনের কূটনৈতিক বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। রোহিঙ্গা প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক মহলে প্রত্যাশিত গুরুত্ব না পাওয়ার পেছনেও কয়েকটি গভীর কারণ রয়েছে। প্রথমত, এটি সিরিয়া বা ইউক্রেনের মতো ভূরাজনৈতিক অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে ছিল না; ফলে পশ্চিমা শক্তিগুলোর নীতিগত উদ্বেগ থাকলেও তা অনেক সময় কার্যকর চাপ হিসেবে রূপ নেয়নি। দ্বিতীয়ত, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও রাশিয়ার অবস্থান, আর আসিয়ানের ‘অ-হস্তক্ষেপ’ নীতি—মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর ও বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক পদক্ষেপকে দীর্ঘদিন দুর্বল করে রেখেছে। তৃতীয়ত, বিশ্বশক্তিগুলোর অনেকেই মানবিক ন্যায়বিচারের চেয়ে আঞ্চলিক স্থিতি, বাণিজ্য, কৌশলগত প্রবেশাধিকার ও রাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিয়েছে। ফলে রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডি আন্তর্জাতিক সহানুভূতি পেয়েছে বটে, কিন্তু সেই সহানুভূতি যথেষ্ট দ্রুত, কঠোর ও ফলপ্রসূ রাজনৈতিক পদক্ষেপে রূপ নেয়নি।

আরও বিস্ময়কর হলো—মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিজে অগ্রণী ভূমিকা নেয়নি। বরং পশ্চিম আফ্রিকার ক্ষুদ্র রাষ্ট্র The Gambia আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা করে। এটি একটি শক্ত বার্তা দেয়—বাংলাদেশ যেন এই সংকটের দ্রুত সমাধানে ততটা আগ্রহী নয়।

এ ছাড়া পুরো বিষয়টি পরিচালনায় দক্ষতার অভাব ছিল সুস্পষ্ট। অভিজ্ঞ কূটনীতিক ও নীতিনির্ধারকদের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে অনভিজ্ঞদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে—কিছু সরকারি কর্মকর্তা রোহিঙ্গাদের কাছে বাংলাদেশি পাসপোর্ট বিক্রি করেছেন, যা শুধু দুর্নীতিই নয়, জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা সংকটের ব্যর্থতা শুধু মিয়ানমারের নিষ্ঠুরতার গল্প নয়; এটি একই সঙ্গে আঞ্চলিক কূটনীতির ভঙ্গুরতা, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের বিলম্ব, এবং মানবিক প্রশ্নে রাষ্ট্রগুলোর দ্বিমুখী অবস্থানেরও দলিল। একদিকে মিয়ানমার ইতিহাস মুছে দিয়ে রোহিঙ্গাদের অদৃশ্য করতে চেয়েছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর একাংশ নৈতিক ভাষণ দিয়েছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় চাপ প্রয়োগে পিছিয়ে থেকেছে। এই দ্বৈত ব্যর্থতার ভেতরেই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রশ্নটি আজও ঝুলে আছে।

রোহিঙ্গা সংকট কেবল একটি মানবিক সমস্যা নয়; এটি ইতিহাস, রাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার সমন্বিত ফল। ২০১৭ সালের পর প্রত্যাবাসন ব্যর্থ হওয়ার পেছনে যেমন মিয়ানমারের অস্বীকৃতি দায়ী, তেমনি বাংলাদেশের নীতিগত ভুল, কূটনৈতিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক হিসাবও এই অচলাবস্থাকে দীর্ঘায়িত করেছে।

প্রয়োজন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি—যেখানে মানবিকতা থাকবে, কিন্তু তা হবে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও কৌশলগত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সমন্বিত। অন্যথায়, এই সংকট শুধু দীর্ঘস্থায়ীই হবে না, বরং তা ভবিষ্যতে আরও গভীর নিরাপত্তা ও সামাজিক চ্যালেঞ্জে রূপ নেবে।

*লেখক: এ কে এম আহসান উল্লাহ, অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক, নিরাপত্তা এবং অভিবাসন। ইউনিভার্সিটি অব ব্রুনেই দারুসসালাম, ব্রুনেই

[email protected]

[email protected]

Read full story at source