ইরানের এখনো অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ও হাজার হাজার ড্রোন মজুত আছে: মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য

· Prothom Alo

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পাঁচ সপ্তাহ ধরে ব্যাপক হামলা চালানোর পরও ইরানের অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার এখনো অক্ষত রয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক মূল্যায়নের বরাতে তিনটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, দেশটির ভান্ডারে এখনো হাজার হাজার ড্রোন জমা আছে।

ইরান সম্পর্কে একটি সূত্র বলেছে, ‘এখনো পুরো অঞ্চলে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর সক্ষমতা তাদের রয়েছে।’

Visit saltysenoritaaz.org for more information.

মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এমন কিছু লঞ্চারের কথা বলা হয়েছে, যেগুলো হামলার কারণে হয়তো মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। তবে পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। ফলে এগুলো আপাতত ব্যবহারের অনুপযোগী হলেও সচল রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী কেন ইরান যুদ্ধ শেষ করতে পারছে না

দুটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, ইরানের ড্রোন সক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশ এখনো টিকে আছে। এর অর্থ হলো, তাদের হাতে এখনো হাজার হাজার ড্রোন রয়েছে।

সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্য বলছে, ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বড় অংশও অক্ষত আছে। যুক্তরাষ্ট্র উপকূলে খুব একটা বিমান হামলা না চালানোয় এগুলো রক্ষা পেয়েছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তারা জনসমক্ষে পূর্ণ সামরিক বিজয়ের দাবি করেছেন। তবে গোয়েন্দা তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। এ তথ্য ইরানের টিকে থাকা সামরিক শক্তি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ও ভিন্ন এক চিত্র তুলে ধরছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তারা জনসমক্ষে পূর্ণ সামরিক বিজয়ের দাবি করেছেন। তবে গোয়েন্দা তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। এসব তথ্য ইরানের টিকে থাকা সামরিক শক্তি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ও ভিন্ন এক চিত্র তুলে ধরছে।

গত বুধবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন, ‘ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। তাদের অস্ত্র কারখানা ও রকেট লঞ্চারগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। এখন খুব অল্পসংখ্যক টিকে আছে।’

মার্কিন বাহিনীর হামলার মুখে ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার। ভিডিওর এই স্ক্রিনশটে দেখা যাচ্ছে, একটি প্রজেক্টাইল (ক্ষেপণাস্ত্র) লঞ্চারটির দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। প্রকাশের আগে ছবিটির একটি অংশ অস্পষ্ট করে দেয় মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত ইরানে ১২ হাজার ৩০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের সামরিক শক্তি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানির মতো শীর্ষ নেতারাও নিহত হয়েছেন।

পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল‘যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানি শাসনব্যবস্থার ওপর চরম আঘাত হেনেছে। আমাদের লক্ষ্যগুলো সময়ের আগেই অর্জিত হচ্ছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার ও নৌবাহিনী ধ্বংস করা এবং তাদের প্রক্সি বাহিনীকে নির্মূল করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’

তবে গোয়েন্দা তথ্য বলছে, লঞ্চার ছাড়াও ইরানের কাছে এখনো বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে।

তবে পেন্টাগন কতগুলো অস্ত্র ধ্বংস হয়েছে, তার চেয়ে কী পরিমাণ হামলা কমেছে—সেদিকেই বেশি নজর দিচ্ছে। গত ১৯ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ‘আমাদের বাহিনীর ওপর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও কামিকাজে ড্রোন হামলা ৯০ শতাংশ কমে গেছে।’

এ বিষয়ে সিএনএনের প্রশ্নের জবাবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলেন, বেনামি কিছু সূত্র মরিয়া হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আক্রমণ করতে চাইছে। তারা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র সাফল্যকে খাটো করে দেখছে।

ইরানের হামলার পর ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের বন্দরনগরী হাইফায় আগুন জ্বলতে দেখা যায়। ১৬ জুন

কেলি আরও বলেন, ‘আসল তথ্য হলো, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ৯০ শতাংশ কমেছে। ইরানের নৌবাহিনী নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। দুই-তৃতীয়াংশ উৎপাদন কারখানা ধ্বংস হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখন ইরানের আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ করছে।’

এই মুখপাত্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, তেহরানের সামনে একমাত্র পথ হলো ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে চুক্তি করা, নয়তো আরও ভয়াবহ হামলার মুখে পড়া।

প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানান, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দ্রুত ধ্বংস করা হচ্ছে। তবে ইসরায়েল, উপসাগরীয় দেশ ও মার্কিন সেনারা এখনো নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ছে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কি ভেঙে পড়ছে

পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল সিএনএনের এই প্রতিবেদনকে ‘পুরো ভুল’ বলে দাবি করেছেন।

পার্নেল বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানি শাসনব্যবস্থার ওপর চরম আঘাত হেনেছে। আমাদের লক্ষ্যগুলো সময়ের আগেই অর্জিত হচ্ছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার ও নৌবাহিনী ধ্বংস করা এবং তাদের প্রক্সি বাহিনীকে নির্মূল করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলেন, বেনামি কিছু সূত্র মরিয়া হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আক্রমণ করতে চাইছে। তারা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র সাফল্যকে খাটো করে দেখছে।

ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, ইরানের সচল লঞ্চারের সংখ্যা আরও কম, মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। তবে সুড়ঙ্গ বা গুহায় চাপা পড়া কিংবা অকেজো হয়ে পড়া লঞ্চারগুলোকে এই হিসাবের মধ্যে ধরছেন না তাঁরা। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্রগুলো এ তথ্য জানিয়েছে।

আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযান শেষ হবে বলে গত বুধবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন।

মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করা একটি সূত্র ট্রাম্পের এই লক্ষ্যকে ‘অবাস্তব’ বলে উল্লেখ করেছে। ইরানের হাতে এখনো যা শক্তি আছে, তাতে এত দ্রুত যুদ্ধ শেষ হওয়া অসম্ভব বলে মনে করছে তারা।

ইরানের নিচু উচ্চতার ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্রে হিমশিম খাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী  ইসরায়েলের তেল আবিবে নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সৃষ্ট শক্তিশালী বিস্ফোরণ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এ ছবিটি তোলা হয়

সূত্রটি বলেছে, ‘আমরা ঠিকই তাদের ওপর চরম আঘাত চালিয়ে যেতে পারি, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু কেউ যদি ভাবে, দুই সপ্তাহে সব শেষ হয়ে যাবে, তবে সে ভুল ভাবছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ চলতি সপ্তাহে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ইরানের শক্তি প্রতিনিয়ত কমছে। তিনি আরও বলেন, ‘হ্যাঁ, তারা কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়বে ঠিকই। কিন্তু আমরা সেগুলো ভূপাতিত করব।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ‘এটা লক্ষণীয় যে গত ২৪ ঘণ্টায় ইরান সবচেয়ে কম ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। তারা মাটির নিচে লুকিয়ে থাকলেও আমরা তাদের খুঁজে বের করব।’

ইরানবিদ্বেষী হেগসেথ আরও বলেন, ‘এটা লক্ষণীয় যে গত ২৪ ঘণ্টায় ইরান সবচেয়ে কম ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। তারা মাটির নিচে লুকিয়ে থাকলেও আমরা তাদের খুঁজে বের করব।’

সাম্প্রতিক গোয়েন্দা মূল্যায়নের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা দুটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, মাটির নিচে লুকিয়ে রাখার সক্ষমতার কারণেই মূলত ইরানের লঞ্চারগুলো পুরোপুরি অকেজো করা যাচ্ছে না। কয়েক দশক ধরে এমন যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে সুড়ঙ্গ ও গুহার বিশাল নেটওয়ার্কের ভেতর লঞ্চারগুলো লুকিয়ে রেখেছে ইরান। এ কারণে সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

ইরানের রাজধানী তেহরানে প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে ২৬ মার্চ ছবিটি তোলা

দুটি সূত্রের দাবি, ইরান সফলভাবে তাদের ভ্রাম্যমাণ প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে এবং দ্রুত জায়গা বদলাচ্ছে। এতে লঞ্চারগুলোর অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইয়েমেনে ইরানের অন্যতম প্রক্সি শক্তি হুতিদের মোকাবিলা করতে গিয়েও একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ আনিকা গানজেভেল্ড বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখন বিভিন্ন সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ এবং সেখানে ব্যবহৃত বুলডোজারের মতো ভারী যন্ত্রপাতির ওপর হামলা বাড়িয়েছে।
হরমুজ প্রণালি খুলে দিতেও কোনো কূলকিনারা পাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি স্বীকার করেছে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ সচল করার নিশ্চয়তা তারা দিতে পারছে না। ইরানের উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এখনো অক্ষত রয়েছে। কারণ, মার্কিন বাহিনী সেগুলোর দিকে এখনো সেভাবে নজর দেয়নি। তবে এই অস্ত্রগুলোও এখন মাটির নিচে লুকিয়ে ফেলা হয়েছে, যা খুঁজে বের করা দুষ্কর।

ইরানের একটি অজ্ঞাত স্থানে মাটির নিচে অবস্থিত ক্ষেপণাস্ত্র ডিপো। ৮ মার্চ, ২০১৬

সূত্রমতে, ইরানের মূল নৌবাহিনী ধ্বংস হলেও ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌ-সক্ষমতার অর্ধেক অংশ এখনো টিকে আছে। তাদের হাতে এখনো কয়েক শ বা হাজারখানেক ছোট নৌকা ও ড্রোন বোট (ইউএসভি) রয়েছে।

ইরানের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের বিষয়ে নিশ্চিত যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, গত বুধবার পর্যন্ত ইরানের ১৫৫টির বেশি নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞ আনিকা গানজেভেল্ডের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কোন নৌবাহিনীর কথা বলছে, তা স্পষ্ট নয়।

ইরানের দক্ষিণ উপকূলের গোপন একটি স্থানে সামরিক মহড়া চলাকালে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের দৃশ্য। ১৯ জানুয়ারি ২০২৪

মার্কিন এই বিশেষজ্ঞ বলেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার কাজটি মূলত আইআরজিসি নৌ শাখাই করছে।

গানজেভেল্ড বলেন, ‘ইরানের প্রক্সি বাহিনী ও ড্রোন সক্ষমতা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। গত কয়েক দিনে ইরান এটা প্রমাণ করেছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ লক্ষ্য করে হামলার শক্তি এখনো তাদের আছে।’

এই বিশেষজ্ঞ আরও যোগ করেন, ‘দেশটির এই সক্ষমতা যদি পুরোপুরি নির্মূল করতে হয়, তবে এখনো অনেক লক্ষ্যবস্তু বাকি রয়েছে।’

খামেনিকে হত্যায় নেতানিয়াহুর শেষ মুহূর্তের যুক্তি কি ট্রাম্পকে ইরান হামলায় প্ররোচিত করেছিল

Read full story at source