বন বিভাগ কেন ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে
· Prothom Alo

কক্সবাজারের চকরিয়ায় একটি বন্য হাতিকে হত্যার পর মাটিতে পুঁতে রাখা এবং তার ওপর ঘর তুলে দিয়ে তথ্য গোপনের নির্মম ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে। এটি কেবল গুরুতর অপরাধই নয়—বরং আমাদের মানবিকতার চরম অবক্ষয়ের প্রতিফলনও। অত্যন্ত পরিকল্পিত ও নৃশংসভাবে দুষ্কৃতকারীরা হাতিটিকে হত্যা করেছে। তারা হাতিটিকে কেবল মাটিচাপা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং সন্দেহ এড়াতে তার ওপর একটি কাঁচা ঘরও তুলে দিয়েছিল। আরও দুঃখজনক হচ্ছে, এক মাস আগে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড বন বিভাগ টের পেল কেবল দুর্গন্ধ ছড়ানোর পর।
Visit bettingx.club for more information.
বন বিভাগের প্রাথমিক ধারণা, আবাদি জমির ফসল রক্ষায় হাতিটিকে গুলি করে অথবা জেনারেটরের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ফসল রক্ষা কি একটি প্রাণ কেড়ে নেওয়ার বৈধ কারণ হতে পারে? নাকি বনভূমি দখল করে মানুষের বসতি ও চাষাবাদ বিস্তারই এই সংকটের মূলে?
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চল একসময় ছিল এশীয় হাতির অভয়ারণ্য। কিন্তু গত কয়েক দশকে এই চিত্র ভয়াবহভাবে বদলে গেছে। বনাঞ্চল উজাড়, পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প এবং হাতির চলাচলের প্রাচীন পথ বা ‘করিডর’ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাতি ও মানুষের সংঘাত এখন চরমে। যখন হাতিরা নিজেদের আবাস হারিয়ে খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে আসে, তখন মানুষ তাদের শত্রু মনে করে ফাঁদ পাতে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে কিংবা বিষ প্রয়োগে হত্যা করে। গত কয়েক বছরে এই অঞ্চলে হাতির মৃত্যুর যে পরিসংখ্যান, তা যেকোনো সচেতন মানুষকে শিউরে তুলবে।
আইনগতভাবে হাতি হত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের সাহসী করে তুলছে। চকরিয়ার এই ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ডায়েরি বা মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত অপরাধীরা কি শেষ পর্যন্ত শাস্তি পাবে? বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইনে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রয়োগ অত্যন্ত নগণ্য। বন বিভাগের নজরদারিতেও রয়েছে বিশাল ফাঁক।
হাতি বিলুপ্তির দিকে চলে যাওয়ায় ওই অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য ধসে পড়ার মুখে। কেবল গুটিকয় বনকর্মীর টহল দিয়ে এই বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা, ফসলের ক্ষতির জন্য সরকারি ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থার সহজীকরণ এবং হাতির করিডরগুলো পুনরুদ্ধারে কঠোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
আমরা কি চাই আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কেবল জাদুঘরে হাতির কঙ্কাল দেখুক? হাতি হত্যাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, বন্য প্রাণীর বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারলে মানুষও শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির রোষানল থেকে বাঁচতে পারবে না। উন্নয়নের নামে বনবিনাশী কর্মকাণ্ড বন্ধ হোক এবং বন্য প্রাণীদের তাদের আদি নিবাসে শান্তিতে থাকতে দেওয়ার পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়া হোক।