ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি, ক্লিনিক ও গাড়িতে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা–অগ্নিসংযোগ চলছেই

· Prothom Alo

ইসরায়েলের অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা গত সপ্তাহান্তে অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ও সম্পত্তির ওপর ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। তারা একটি ক্লিনিকে আগুন দিয়েছে, বেসামরিক নাগরিকদের ওপর গুলি চালিয়েছে এবং একটি স্কুলে ভাঙচুর করেছে।

Visit freshyourfeel.org for more information.

ফিলিস্তিনি সংবাদমাধ্যম গতকাল সোমবার জানিয়েছে, বসতি স্থাপনকারীরা নাবলুসের দক্ষিণে হাওয়ারা শহরের ছেলেদের একটি মাধ্যমিক স্কুলে হানা দেয়। সেখানে তারা ফিলিস্তিনি পতাকা নামিয়ে ইসরায়েলি পতাকা ওড়ায় এবং দেয়ালে ‘আরবেরা নিপাত যাক’ লিখে রাখে।

এর আগে গত রোববার গভীর রাতে নাবলুস ও রামাল্লার কাছে বেশ কিছু হামলার খবর পাওয়া গেছে। নাবলুসের পূর্বে দেইর আল-হাতাব শহরে সশস্ত্র অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এতে অন্তত নয়জন ফিলিস্তিনি আহত হন। তাঁদের মধ্যে একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

রামাল্লার পূর্বে বুরকা শহরে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা একটি ক্লিনিক ও একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

এর আগের রাতে জেনিন, নাবলুস ও সালফিট এলাকায় একসঙ্গে বেশ কিছু হামলার খবর পাওয়া গেছে।

অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা সবচেয়ে বড় হামলা চালিয়েছে জেনিনের দক্ষিণে আল-ফান্দাকুমিয়া ও সিলাত আদ-ধাহর শহরে। সেখানে হোয়েশ বসতি থেকে আসা লোকজন হামলা চালায়। এই হোয়েশ বসতিটি ওই দুই শহরের জমির ওপর নির্মিত। ২০০৫ সালে খালি করে দেওয়ার পর বিগত কয়েক বছরে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা আবার সেখানে তাদের উপস্থিতি জোরদার করছে।

আল-ফান্দাকুমিয়াতে বেশ কিছু ফিলিস্তিনির ঘরবাড়ি ও যানবাহন পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে এক ফিলিস্তিনি বাড়ির মালিক গুরুতর আহত হয়েছেন। দুই শহর মিলিয়ে আরও ১০ জন সামান্য আহত হয়েছেন।

হুসাম আল-জুবি নামের একজনের ঘর পুরোপুরি পুড়ে গেছে। তিনি জানান, তিনি যখন তাঁর চাচার বাড়িতে ছিলেন, তখন ফোনে খবর পান, তাঁর বাড়িতে আগুন লেগেছে। ফিরে এসে দেখেন, পুরো বাড়ি দাউ দাউ করে জ্বলছে।

মিডল ইস্ট আইকে জুবি বলেন, তারা (অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা) সবকিছু পুড়িয়ে দিয়েছে, জানালা ভেঙেছে এবং আগুনে সব আসবাব পুড়িয়ে দিয়েছে। এমনকি তারা ছাদের টাইলস খুলে ফেলে সেখান দিয়ে ও জানালা দিয়ে পেট্রলবোমা ছুড়ে মেরেছে। এতে সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে আগুন ধরে যায়।

জুবি আরও বলেন, গ্রামের এই হামলায় ২০০ শতাধিক অবৈধ বসতি স্থাপনকারী অংশ নিয়েছিল। এটি মধ্যরাতের কিছুক্ষণ আগে শুরু হয়ে প্রায় ২০ মিনিট ধরে চলে।

সামি আজম নামের এক বাসিন্দা বলেন, হামলাকারীরা হেঁটে এসে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বাড়িগুলোর দিকে এগোতে থাকে। দেখে মনে হয়েছে, তারা সুপরিকল্পিতভাবে হামলা চালাতে এসেছে।

আজম বলেন, তারা হঠাৎ বাড়িগুলোতে হামলা চালায় এবং সামনে যা পেয়েছে তাতেই আগুন দিয়েছে। তারা শহরে আসা একজন চিকিৎসকের গাড়ি ও এক প্রতিবেশীর বাস পুড়িয়ে দিয়েছে। অন্য এক প্রতিবেশীর বাড়িতে পেট্রলবোমা ছুড়লে পুরো বাড়িটি পুড়ে যায়।

ইসরায়েলি অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি পরিদর্শনে যান ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তারা। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, পশ্চিম তীর

সমন্বিত হামলা

আল-ফান্দাকুমিয়াতে গত শনিবার রাতে হামলার সময় আরও কয়েকটি গ্রামে প্রায় একই সময়ে একই ধরনের হামলা চালানো হয়।

সিলাত আল-ধাহরে ১৫০ জনের বেশি অবৈধ বসতি স্থাপনকারী ফিলিস্তিনিদের বাড়িতে হামলা চালায়, গাড়িতে আগুন দেয়, জানালা ভাঙচুর করে ও দেয়ালে বর্ণবাদী স্লোগান লিখে রাখে।

শহরের বাসিন্দা আদেল আবু আলী বলেন, আল-ফান্দাকুমিয়াতে হামলার পর রাত দেড়টার দিকে তারা এখানে হামলা করে। তিনি একে অত্যন্ত নৃশংস ও ‘খুন করার উদ্দেশ্যে’ হামলা হিসেবে বর্ণনা করেন।

আবু আলী বলেন, ‘তারা বেশ কিছু বাড়ির জানালা ভেঙে ফেলে, যেখানে নারী ও শিশুরা ছিল। তারা ঘরের ভেতরে পেট্রলবোমা ছুড়ে মারে। তারা অনেকগুলো গাড়িতে আগুন দেয়। আমাদের মনে হচ্ছিল, ২০১৫ সালে দুমায় যেভাবে দাওয়াবশাহ পরিবারকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, আমাদের শহরেও তার পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে।’

বসতি স্থাপনকারীরা দেয়ালে প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়ে স্লোগান লিখেছে, যা থেকে বোঝা যায় তারা বাসিন্দাদের ভেতরে রেখেই পুরো শহর জ্বালিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছিল।

হামলার প্রায় আধা ঘণ্টা পর বসতি স্থাপনকারীরা চলে গেলে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী শহরে ঢোকে। তবে তারা শহরের প্রধান প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয়। ফলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সময়মতো পৌঁছাতে পারেননি এবং আগুনের ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়া বাসিন্দাদের কাছে অ্যাম্বুলেন্স সময়মতো যেতে পারেনি।

আবু আলী যোগ করেন, ‘আমাদের শহরে এর আগে কখনো এত বড় আকারের হামলা হয়নি।’

সহিংসতা নাবলুসের দক্ষিণে জালুদ ও কারিউত শহরেও ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের বাড়ি ও গাড়িতে আগুন দিয়েছে। জালুদে ‘মেডিকেল রিলিফ সোসাইটি’ ভবনের একাংশ পুড়িয়ে দিয়েছে।

অ্যাকটিভিস্ট বাশার আল-কারিউতি বলেন, জালুদে পাঁচটি গাড়ি ও ক্লিনিকের একাংশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা একটি বাড়ি এবং মসজিদেও আগুন দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এ ছাড়া ১০টির বেশি বাড়ি ও দুটি গাড়ির জানালা ভাঙা হয়েছে এবং হামলা ঠেকাতে গিয়ে চার তরুণ আহত হয়েছেন।

এ ছাড়া নাবলুস ও রামাল্লার মধ্যবর্তী রাস্তায় চলাচলকারী বেশ কিছু ফিলিস্তিনি গাড়িতে পাথর ছোড়া হয়েছে।

শনিবার ভোরে নাবলুসের কাছে বেইত ইবা শহর থেকে একটি গাড়ি চুরির পর সড়ক দুর্ঘটনায় এক অবৈধ বসতি স্থাপনকারী নিহত হয়। এর প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বড় মোড়গুলোতে বিক্ষোভের ডাক দেয় অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা।

সড়কগুলোতে লাগাতার হামলার কারণে ফিলিস্তিনি লিয়াজোঁ অফিস বাসিন্দাদের এক শহর থেকে অন্য শহরে যাতায়াত যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছে। প্রধান সড়কে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের অবস্থানের কারণে অনেক ফিলিস্তিনি রোববার সকাল পর্যন্ত বাড়ি ফিরতে পারেননি।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বাড়লেও ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন শুরুর পর তা আরও চরম আকার ধারণ করেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় অন্তত ছয়জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

Read full story at source