পানিসংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা ভালো উদ্যোগ, তবে কার্যকর বাস্তবায়ন দরকার

· Prothom Alo

ওয়াটারএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহান। তিনি জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির একজন সদস্য। এই কমিটি গত বছর দেশের কয়েকটি এলাকাকে পানিসংকটাপন্ন ঘোষণা করেছে। পানি সংরক্ষণ ও ভবিষ্যতে পানির সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করতেই এ সিদ্ধান্ত। সেই ঘোষণার নানা দিক, দেশের পানিসম্পদের বর্তমান অবস্থা, পানিসম্পদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে তিনি প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পার্থ শঙ্কর সাহা। 

জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির সাম্প্রতিক সভায় কয়েকটি জেলাকে অতি উচ্চ, উচ্চ ও মধ্যম পানিসংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আপনার দৃষ্টিতে এই সিদ্ধান্ত কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

Visit aportal.club for more information.

হাসিন জাহান: পরিষদের নির্বাহী কমিটির একজন সদস্য আমি। গত আগস্ট মাসে কমিটির সভায় চারটি এলাকাকে পানিসংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। কারণ, আমরা বাংলাদেশে সব সময় পানিসংকট নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু আসলে পানির সংকট যে কতটা জটিলতার দিকে যাচ্ছে বা এটি দেশের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, সে সম্পর্কে আমাদের দেশের অনেকেরই ততটা ধারণা নেই। সামগ্রিকভাবে পানি ব্যবস্থাপনায় কৃষি, শিল্প এবং খাওয়ার পানির ব্যবহার নিয়ে সম্মিলিত পরিকল্পনা ও অবকাঠামোয় যথাযথ বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা এবং গবেষণাভিত্তিক উপাত্তনির্ভর প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জরুরি। কাজেই শুধু সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করলেই হবে না, আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ হবে যে কীভাবে এসব এলাকায় সামগ্রিকভাবে পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা করে পানির সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায় এবং সেই অভিজ্ঞতা দেশের অন্যান্য জায়গায় কাজে লাগিয়ে পানিসম্পদের সামগ্রিক সুরক্ষা করা যায়।

রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। এই সংকটের প্রধান কারণগুলো আপনি কীভাবে দেখেন? সংকট সমাধানে কী করা দরকার?

হাসিন জাহান: বরেন্দ্র অঞ্চলে চাষাবাদের জন্য প্রচুর পরিমাণে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে সেচের কাজে ব্যবহার করা হয়। এটা একটা বড় কারণ পানির স্তর নেমে যাওয়ার পেছনে। পাশাপাশি বরেন্দ্র এলাকার মাটির গঠনের কারণে এখানে রিচার্জ অর্থাৎ বৃষ্টির পানির পুনর্ভরণ অনেক কম হয়। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখানে খরার প্রবণতা বাড়ছে। এসব এলাকায় যেসব পুকুর–খাল–বিল ইত্যাদি ছিল, সেগুলো জলাধার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা থাকার কারণে বেদখল বা ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে কৃষির উৎপাদন ও খাওয়ার পানির নিরাপত্তা দুটোই এখন ঝুঁকির মুখে।

শুধু বরেন্দ্র অঞ্চল নয়, বরং সরকারের উচিত সারা দেশের ভূগর্ভস্থ পানির ম্যাপিং করা এবং সেই সঙ্গে পানির বর্তমানের উৎসগুলো চিহ্নিত করা। তাহলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কতটা নিচে নেমে গেছে, কোথায় কোথায় ওয়াটার মাইনিং হয়েছে এবং বিভিন্ন স্তরে পানির গুণগত মান কেমন, তা সঠিকভাবে জানা সম্ভব হবে। তখন সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে যে কোথায় কৃত্রিমভাবে ভূগর্ভস্থ পানির রিচার্জ বাড়ানো দরকার, কোথায় বিকল্প পানির উৎস ব্যবহার করতে হবে, অথবা কোন এলাকাকে পানির সংকটাপন্ন অঞ্চল ঘোষণা করে পানির ব্যবহার সীমিত করা প্রয়োজন। শুধু ভূগর্ভস্থ পানি নয়, নদী-নালা, খাল-বিল ও পুকুরের মতো ওপরের উৎসগুলোকেও ম্যাপ করা প্রয়োজন এবং দখল হয়ে যাওয়া জলাশয়গুলো পুনরুদ্ধার করে দেশের পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার। 

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড , জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, ওয়ারপো, আইডব্লিউএম ও বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষের মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রচুর তথ্য বা ডেটা রয়েছে। এই বিচ্ছিন্ন তথ্যগুলোকে একটি একক ও নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্মে এনে বিশ্লেষণ করলে বড় কোনো খরচ ছাড়াই পানির সঠিক ব্যবহারের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব। 

জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির গত ২৬ আগস্টের সভায় পানিসংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছিল। সভার সিদ্ধান্ত ছিল, সংকটাপন্ন এলাকাগুলোর পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। সেগুলো কতটুকু এগোল বলে আপনি জানেন? 

হাসিন জাহান: জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু  এটার বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর। সাধারণত আমাদের এখানে কোনো একটি সিদ্ধান্ত হলে সেটা বাস্তবায়ন করতে প্রথম দিকে তো সময় লাগেই। কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও থাকে। হয়তো সেসব কারণে এই সিদ্ধান্ত কার্যকরের পর্যায়ে যেতে সময় লাগছে। কমিটির সদস্য হিসেবে আমাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সঙ্গে সরাসরি জড়িত হওয়ার খুব একটা সুযোগ নেই। আবার এই কমিটির সভাও অনেক দীর্ঘ সময় পরপর হয়।

যেসব এলাকাকে পানিসংকটাপন্ন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে পানির ব্যবস্থাপনা কী হওয়া উচিত, বিভিন্ন খাতে পানি ব্যবহারে কী করা উচিত বা উচিত নয়, এসব ব্যাপারেও আলোচনা হয়েছে। তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো কতটা গুরুত্বের সঙ্গে এটা মাঠপর্যায়ে নিয়ে যাবে, তা নির্ভর করে সবার একটা সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর।

সংকটাপন্ন এলাকার পুকুরের তথ্য জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটি সংগ্রহ করবে। এ কাজ কতটুকু হয়েছে বলে জানেন?

হাসিন জাহান: পানিসংকটপূর্ণ এলাকায় পুকুরের তথ্য সংগ্রহ সরকারি পর্যায়ে কতটুকু হয়েছে, এটা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমার পক্ষে বলা কঠিন। তবে এটুকু বলতে পারি যে বিষয়টিকে সহজ করা সম্ভব। উপজেলা, জেলা, ইউনিয়নপর্যায়ে যেসব পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি আছে তাদের সঙ্গে কথা বললে দ্রুত সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে। তা ছাড়া তথ্য সংগ্রহ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে স্থানীয় পর্যায়ে কত আয়তনের কতটা পুকুর আছে এবং সেটা কার অধীন আছে, সে সম্পর্কে যেসব তথ্য ইতিমধ্যে আছে সেগুলো নিয়ে কাজ শুরু করে পাশাপাশি তথ্যের হালনাগাদ করা যেতে পারে। 

বাংলাদেশে কৃষি, বিশেষ করে বোরো ধান চাষে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা রয়েছে। এই নির্ভরতা কমাতে কী ধরনের নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন?

হাসিন জাহান: আপনি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন তুলেছেন। একদিকে আমরা বলছি—এসব এলাকায় পানির ব্যবহার কমাতে হবে, সংযত হতে হবে। অন্যদিকে বাস্তবতা হলো, একই এলাকাগুলোতেই ব্যাপকভাবে বোরো ধান চাষ হয়, যা আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—তাহলে করণীয় কী?

প্রথমত, বোরো ধান যেহেতু পানিনির্ভর, তাই এর বিকল্প হিসেবে কম পানি লাগে এমন ফসল—যেমন ডাল, তেলবীজ, ভুট্টা চাষে প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। তবে এখানে একটি বাস্তব উদ্বেগ আছে, ধানের উৎপাদন কমে গেলে সারা বছরের খাদ্যচাহিদা কীভাবে পূরণ হবে? এই জায়গায় আমাদের দরকার একটি সমন্বিত, অঞ্চলভিত্তিক ক্রপ জোনিং করে কী ধরনের শস্য কোথায় কী পরিমাণ হলে দেশের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয় সেটা নিয়ে পরিকল্পনা করা।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষি ও পরিবেশে বড় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান বাস্তবতায় জলবায়ু পরিবর্তন, মাটির লবণাক্ততাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে ক্রপ জোনিং আপডেট করা জরুরি। এতে একদিকে যেমন ফসল উৎপাদনে ভারসাম্য আসবে, অন্যদিকে পানির অপচয়ও কমবে।

দ্বিতীয়ত, আমাদের পানির ব্যবহারে বড় ধরনের অদক্ষতা রয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই কৃষিতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এই পুরোটা যে অপরিহার্য—তা নয়। সাশ্রয়ী সেচপদ্ধতি, যেমন AWD (Alternate Wetting and Drying) প্রযুক্তি ব্যবহার করলে অনেক পানি সাশ্রয় করা সম্ভব।

তৃতীয়ত, অনিয়ন্ত্রিতভাবে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানাগুলোও বড় ভূমিকা রাখছে। তারা কতটুকু পানি উত্তোলন করছে, তার কোনো সঠিক হিসাব বা নিয়ন্ত্রণ নেই। অথচ পানি আইন ২০১৩ ও ওয়াটার রুল ২০১৮-তে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই বললেই চলে।

সুতরাং কৃষি ও শিল্প—উভয় খাতে পানির ব্যবহারকে জবাবদিহির আওতায় এনে, পরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

চট্টগ্রামের পটিয়ার কিছু এলাকাকেও পানিসংকটাপন্ন তালিকায় আনা হয়েছে। উপকূলীয় ও পাহাড়ি অঞ্চলে পানির সংকটের প্রকৃতি কি উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সংকটের চেয়ে ভিন্ন। এই দুই এলাকায় সংকটের ধরন ও সমাধানের উপায় কী?

হাসিন জাহান: উপকূল ও পাহাড়—বাংলাদেশের এই দুই ভৌগোলিক অঞ্চলে পানিসংকটের ধরন ভিন্ন হলেও সংকটটি ক্রমেই তীব্র হচ্ছে এবং মানুষের জীবন-জীবিকায় বড় প্রভাব ফেলছে।

উপকূলীয় এলাকায় প্রধান সমস্যা হলো লবণাক্ততা। এখানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধীরে ধীরে লবণাক্ত হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি বছরের একটা লম্বা সময় নদীর পানিও নোনা থাকে। ফলে স্বাভাবিকভাবে ধানসহ প্রচলিত ফসল চাষ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতায় অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কৃষিকাজ থেকে সরে গিয়ে লবণাক্ত পানিতে টিকে থাকতে পারে এমন মাছ—যেমন তেলাপিয়া, চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। এতে স্বল্প মেয়াদে আয় বাড়লেও খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

অন্যদিকে পাহাড়ি অঞ্চল, বিশেষ করে বান্দরবান ও রাঙামাটিতে পানির প্রধান উৎস প্রাকৃতিক ঝরনা। কিন্তু নির্বিচার বন উজাড়ের কারণে এসব ঝরনার উৎস ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে সেগুন বা রাবারের বাগান সম্প্রসারণের ফলে মাটির স্বাভাবিক গঠন ও উদ্ভিদবৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে। এতে মাটিতে ঘাস জন্মাতে পারে না, ফলে বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ জলাধার সমৃদ্ধ করার বদলে দ্রুত গড়িয়ে নিচে নেমে যায়। এর ফলে ঝরনার পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে শুকিয়েও যাচ্ছে।

এই দুই অঞ্চলের সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন ভিন্নধর্মী কিন্তু সমন্বিত উদ্যোগ। উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে, যাতে অন্তত পানীয় জলের সংকট কিছুটা লাঘব হয়। একই সঙ্গে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা ও লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের চাষও গুরুত্ব পেতে পারে।

পাহাড়ি এলাকায় ঝরনার উৎস সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। এ জন্য বন উজাড় বন্ধ করা, প্রাকৃতিক বন পুনরুদ্ধার ও সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে স্থানীয় গাছপালা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিশ্চিত করা দরকার।

সর্বোপরি, প্রকৃতিতে পানির স্বাভাবিক চক্র ও প্রবাহ বজায় রাখতে পরিবেশ সংরক্ষণকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।

এর আগে বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (২০২৩–২০৫০) ১১টি এলাকাকে জলবায়ু–সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। এসব ঘোষণার পর বাস্তবে কর্মকাণ্ড কতটুকু সঠিকভাবে এগোচ্ছে বলে আপনার মনে হয়?

হাসিন জাহান: প্রথমত, নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিভিন্ন খাতে আমাদের সুস্পষ্ট ও মানসম্মত বিভিন্ন নীতিমালা রয়েছে। কিন্তু মূল দুর্বলতা দেখা যায় বাস্তবায়নের জায়গায়।

এই নীতিমালাগুলো কার্যকর করতে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। মাঠপর্যায়ে কাজগুলো প্রায়ই নিজস্ব ধারা বা অভ্যাস অনুযায়ী চলতে থাকে, কিন্তু সেগুলো নীতিমালার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেটি যাচাই করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। একইভাবে আমরা নীতিমালায় কতটা অবদান রাখছি বা সেগুলোর লক্ষ্য পূরণে কতটা এগোচ্ছি—এ বিষয়েও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে।

এই জবাবদিহির অভাব সব পক্ষেই দেখা যায়, যারা নীতিমালা প্রণয়ন করেন, তাঁরা পরবর্তী সময়ে সেই নীতিমালার বাস্তবায়ন কতটা হচ্ছে, তা নিয়মিতভাবে অনুসরণ বা মূল্যায়ন করেন না। অন্যদিকে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মাঠপর্যায়ে কাজ করার সময় অনেক ক্ষেত্রেই নীতিমালাগুলো গভীরভাবে বিবেচনা করে কার্যক্রম পরিচালনা করে না।

ফলে কাগজে-কলমে শক্তিশালী নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন সীমিত থেকে যায়। বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এই ব্যবধান দূর করা সম্ভব নয়—এটাই বর্তমান বাস্তবতা। 

জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে আপনি এনজিও প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন। ঘোষিত পানিসংকটাপন্ন এলাকাগুলোতে এনজিওগুলো কী ভূমিকা রাখতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

হাসিন জাহান: সাধারণত আমরা এনজিওর ভূমিকাকে অতিরঞ্জিত করে দেখি এবং মনে করি যে মানুষের আচরণগত পরিবর্তনসহ অনেক কিছুর দায়ভারই এনজিওর। কিন্তু এনজিওগুলো চাইলেই সবকিছু করতে পারে না, কারণ তাদের নির্দিষ্ট ম্যান্ডেট থাকে এবং তারা সেই প্রকল্পের কার্যক্রমের বাইরে কাজ করতে সক্ষম নয়।

প্রকৃতপক্ষে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার প্রয়োজন যেখানে চারটি মূল পক্ষ—কেন্দ্রীয় সরকার, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ, সংশ্লিষ্ট গবেষণা সংস্থাসমূহ, এনজিওসমূহ ও সাধারণ জনগণ একসঙ্গে কাজ করবে। এই প্রক্রিয়ায় সরকার নীতি নির্ধারণ করবে, যা স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে। তবে পুরো কাজটি করার ক্ষেত্রে গবেষণা সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং সেই বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছাতে হবে। এ ক্ষেত্রে এনজিওর মূল কাজ হবে সরকারের নীতি উন্নয়নে সহায়তা করা, স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করা ও সরকারের নীতিমালা বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত হলে এবং পাশাপাশি নাগরিকেরা নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হলে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। উদাহরণস্বরূপ, একজন নাগরিক যদি সুপেয় পানির অপচয় করে গাড়ি ধোয়ার কাজে ব্যবহার করেন কিংবা একজন শিল্পপতি যদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করেন, তবে সেখানে এনজিওর সরাসরি কিছু করার থাকে না।

তাই প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন, হোক তা দেশের নাগরিক হিসেবে কিংবা স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে। আমাদের কী করা উচিত, তা অনুধাবন করতে পারলেই প্রকৃত পরিবর্তন আসবে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে সামান্য সচেতনতাও জাতীয় পানিনিরাপত্তায় এক বিশাল অবদান রাখতে পারে।

Read full story at source