রমজানকে কাজে লাগিয়ে ধূমপানকে বিদায় দিন
· Prothom Alo

রমজানের প্রতিটি সন্ধ্যায় একটি পরিচিত দৃশ্য দেখা যায়—ইফতারের পর টেবিলের সামনে কফির কাপ নিয়ে বসে একজন ব্যক্তি অভ্যাসবশত সিগারেটের প্যাকেটের দিকে হাত বাড়াচ্ছেন। মনে মনে নিজেকে বোঝাচ্ছেন, ‘সারাদিন পর একটা সিগারেট খেলে আর কী হবে?’
কিন্তু আসক্তি নিয়ে কাজ করা গবেষকদের মতে, এই একটি সিগারেটই আপনার মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সার্কিট’ বা পুরস্কার চক্রকে পুনরায় সচল করে দেয়, যা আপনাকে দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরশীলতার শিকলে বন্দি করে রাখে।
Visit livefromquarantine.club for more information.
রমজানের দীর্ঘ সময় নিকোটিন থেকে দূরে থাকা শুধু ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, বরং এটি ধূমপায়ীদের জন্য নিজের ইচ্ছাশক্তিকে পুনর্গঠনের একটি বড় সুযোগ।
কয়েক ঘণ্টা নিকোটিন না নিলে শরীরের স্নায়ুতন্ত্র নিজেকে পুনরায় গুছিয়ে নিতে শুরু করে। একে বলে ‘উইথড্রয়াল সিম্পটম’ বা প্রত্যাহারজনিত লক্ষণ, যা রমজানে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো যায়।
ধূমপায়ীর মস্তিষ্কে রমজানে কী ঘটে
নিকোটিন মস্তিষ্কের ‘নিউক্লিয়াস অ্যাকাম্বেন্স’ নামক অংশে ডোপামিন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়, যা সাময়িকভাবে আনন্দের অনুভূতি দেয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ক এই কৃত্রিম উত্তেজনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে সিগারেট ছাড়া মানুষের স্বাভাবিক মেজাজ বা ‘বেসলাইন মুড’ নিচে নেমে যায়।
তখন ধূমপায়ী ব্যক্তি আনন্দ পেতে নয়, বরং নিজেকে ‘স্বাভাবিক’ অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে সিগারেটের ওপর নির্ভর করতে শুরু করেন। রমজানে সাহ্রি থেকে ইফতার পর্যন্ত দীর্ঘ সময় নিকোটিন শরীরে না থাকায় একটি চমৎকার সুযোগ তৈরি হয়।
২০০৪ সালে ‘নিকোটিন অ্যান্ড টোব্যাকো রিসার্চ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, কয়েক ঘণ্টা নিকোটিন না নিলে শরীরের স্নায়ুতন্ত্র নিজেকে পুনরায় গুছিয়ে নিতে শুরু করে।
একে বলে ‘উইথড্রয়াল সিম্পটম’ বা প্রত্যাহারজনিত লক্ষণ, যা রমজানে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো যায়।
রোজা কীভাবে শরীরের ‘প্রদাহ’ নিরাময় করেধূমপান ত্যাগে পাঁচ ধাপের রমজান গাইড
১. সেহরির পরের ‘শেষ সিগারেট’ বর্জন: অনেক ধূমপায়ী মনে করেন সেহরির ঠিক আগে একটি সিগারেট খেলে সারাদিন ভালো কাটবে। কিন্তু নিকোটিনের আয়ু শরীরে মাত্র ২-৩ ঘণ্টা।
অর্থাৎ সকাল ১০টার পর মস্তিষ্ক আবার নিকোটিন চাইতে শুরু করবে। তাই সেহরির পর সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস পুরোপুরি বাদ দিন। প্রয়োজনে প্রথম সপ্তাহে সংখ্যা কমিয়ে আনুন এবং দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে এটি শূন্যে নামিয়ে আনুন।
২. দুপুরের অবসাদকে ‘পুনর্গঠন’ হিসেবে দেখা: দুপুরের দিকে মাথাব্যথা বা খিটখিটে মেজাজ হওয়া মানে আপনার শরীর ভেঙে পড়ছে না, বরং এটি প্রমাণ করে যে আপনার স্নায়ুতন্ত্র নিকোটিনমুক্ত হয়ে নিজেকে মেরামত করছে।
ইফতারের পর অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট সিগারেটের জন্য একটি ‘নিরাপদ বিরতি’ তৈরি করুন। এতে আজান ও সিগারেটের মধ্যকার স্নায়বিক সংযোগটি ভেঙে যাবে।
আমেরিকান কলেজ অব চেস্ট ফিজিশিয়ানস (এসিসিপি)-এর গাইডলাইন অনুযায়ী, এটি একটি সাময়িক অবস্থা। এই সময় অল্প সময় ঘুমিয়ে নিন বা নিজেকে হালকা কোনো কাজে ব্যস্ত রাখুন। জিকির বা তেলাওয়াত মানসিক প্রশান্তিতে সাহায্য করবে।
৩. ইফতারের সেই ‘সংকটপূর্ণ’ মুহূর্ত: ইফতারের আজান শোনামাত্র পানি বা খেজুরের পরিবর্তে সিগারেটে টান দেওয়া একটি ভয়াবহ স্নায়বিক আসক্তি।
এফএমআরআই গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্ক আজান বা ইফতারের সময়ের সঙ্গে সিগারেটের একটি শক্তিশালী সংযোগ তৈরি করে ফেলে।
আজানের পর কেবল পানি ও খেজুর খান। ইফতারের পর অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট সিগারেটের জন্য একটি ‘নিরাপদ বিরতি’ তৈরি করুন। এতে আজান ও সিগারেটের মধ্যকার স্নায়বিক সংযোগটি ভেঙে যাবে।
রোজা : কোরআন যেভাবে সংযমের শিক্ষা দেয়৪. পরিবেশ ও অভ্যাস পরিবর্তন: কফি আর সিগারেটকে আভিজাত্য ভাবা ভুল। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (এনআইএইচ) সুপারিশ করে যে ধূমপানের পরিবেশ ও অনুষঙ্গগুলো পরিবর্তন করা জরুরি।
ইফতারের পর কফি খাওয়ার সময়টি পিছিয়ে দিন। সিগারেটের বদলে পরিবারের সঙ্গে গল্প করুন বা সরাসরি তারাবির নামাজে চলে যান।
৫. ঘুমের আগের হাতছানি: শোয়ার আগে ‘শেষ টান’ দেওয়ার অভ্যাসটি সারাদিনের অর্জনকে নষ্ট করে দেয়। এটি আপনার রক্তে পুনরায় নিকোটিন সরবরাহ করে আসক্তির চক্রকে জীবিত রাখে।
সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৫আর তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না।ঘুমের আগে সিগারেট না খেয়ে হালকা গরম পানিতে গোসল বা বই পড়ার অভ্যাস করুন। আপনার দিনটি যেন ধোঁয়ামুক্ত ও পরিষ্কারভাবে শেষ হয়।
ধর্মীয় ও নৈতিক দায়বদ্ধতা
ইসলাম মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। ধূমপান কেবল নিজের ক্ষতি নয়, বরং দুর্গন্ধ ও পরোক্ষ ধূমপানের মাধ্যমে অন্যেরও ক্ষতি করে।
আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, ‘আর তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৫)
ধূমপান ত্যাগের মাধ্যমে একজন মুমিন তাঁর নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন, যা রোজার অন্যতম উদ্দেশ্য। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিজের ক্ষতি করা যাবে না, অন্যের ক্ষতিও করা যাবে না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩৪১)
সূত্র: আল–জাজিরা ডট নেট
রোজার শেষে ওজন ও ক্ষুধা দুই–ই বাড়ছে: ধর্মীয় সমাধান কী