সিসা বা লোহা থেকে কি আসলেই সোনা বানানো সম্ভব
· Prothom Alo

ছোটবেলায় রূপকথার গল্পে পরশপাথরের কথা পড়েছ নিশ্চয়ই? যে পাথর দিয়ে যেকোনো সস্তা ধাতুকে ছুঁয়ে দিলেই তা ঝকঝকে দামি সোনায় পরিণত হয়! মধ্যযুগের ইউরোপে এই পরশপাথর খোঁজার জন্য রীতিমতো হুলুস্থুল পড়ে গিয়েছিল। সস্তা লোহা বা সিসাকে জাদুকরি উপায়ে সোনায় রূপান্তরের এই প্রাচীন বিদ্যাকে বলা হতো অ্যালকেমি। আর সোনা বানানোর এই বিশেষ প্রক্রিয়াটির নাম ছিল ক্রিসোপোইয়া।
তুমি হয়তো ভাবছ, এসব তো শুধু রূপকথার গালগল্প! কিন্তু যদি বলি, আধুনিক বিজ্ঞান আসলেই লোহা বা সিসাকে সোনায় পরিণত করার উপায় বের করে ফেলেছে? হ্যাঁ, ঠিকই শুনছ! চলো, আসল গল্পটা একটু খুলে বলি।
Visit orlando-books.blog for more information.
সস্তা ধাতুকে সোনায় রূপান্তরের এ ধারণাটি এসেছিল প্রাচীন গ্রিস থেকে। প্যানোপোলিসের দার্শনিক জসিমোস বিশ্বাস করতেন, সাধারণ ধাতুকে সোনায় রূপান্তর করাটা মানুষের আত্মার শুদ্ধিরই প্রতীক। তবে মধ্যযুগে এসে এই ধারণা পুরোপুরি বদলে যায়। তখন মানুষের একটাই লক্ষ্য, যেভাবেই হোক সস্তা ধাতুকে সোনায় রূপান্তর করে রাতারাতি বড়লোক হতে হবে!
এমন কোনো রাত নেই, যে রাতে আমার ঠিকমতো ঘুম হয়পর্তুগালের নোভা ইউনিভার্সিটির প্রত্নতত্ত্ববিদ ও হেরিটেজ বিজ্ঞানী উমবের্তো ভেরোনেসি জানান, তখনকার দার্শনিকদের একটা বিশ্বাস ছিল। তাঁরা মনে করতেন, খনির ভেতরের সব ধাতুই ধীরে ধীরে পেকে সোনায় পরিণত হয়! তাঁদের ধারণা ছিল, সিসা বা লোহার মতো সস্তা ধাতুগুলো অপবিত্র ও কাঁচা। এগুলো মাটির নিচে দীর্ঘদিন থাকলে একসময় পেকে সবচেয়ে বিশুদ্ধ ধাতু সোনায় পরিণত হবে।
সমস্যা হলো, প্রাকৃতিকভাবে এই পাকার কাজ হতে লাখ লাখ বছর লেগে যাবে। তাই অ্যালকেমিস্টরা ভাবতেন, পারদ, সালফার ও লবণের অনুপাত পরিবর্তন করে যদি কোনোভাবে সেই জাদুকরি পরশপাথর বানানো যায়, তবে সিসাকে রাতারাতি পাকিয়ে সোনায় বদলে ফেলা যাবে!
রাজা চার্লসের মুকুটের দাম কতদুই
সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের উন্নতির পর মানুষ বুঝতে পারল, অ্যালকেমি আসলে কোনো বিজ্ঞান নয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রায় এক শতাব্দী ধরে আমাদের আধুনিক নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানীরা ঠিকই সেই সোনা বানানোর গোপন চাবিকাঠি নিজেদের হাতে নিয়ে বসে আছেন!
তুমি নিশ্চয়ই জানো, একটি মৌল লোহা হবে নাকি সোনা, তা নির্ভর করে তার পরমাণুর কেন্দ্রে বা নিউক্লিয়াসে থাকা প্রোটন সংখ্যার ওপর। যেমন সোনার পরমাণুতে ঠিক ৭৯টি প্রোটন থাকে, পারদে থাকে ৮০টি, আর সিসায় থাকে ৮২টি। নিউক্লিয়াসের ভেতরের প্রোটন ও নিউট্রনগুলো স্ট্রং ফোর্স নামে এক প্রচণ্ড শক্তিশালী বল দিয়ে একে অপরের সঙ্গে আঠার মতো লেগে থাকে। সেখান থেকে একটি প্রোটন সরানো কিন্তু ভীষণ কঠিন কাজ।
কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে, তুমি যদি সিসার ৮২টি প্রোটন থেকে প্রচুর শক্তি প্রয়োগ করে কোনোভাবে তিনটি প্রোটন সরিয়ে ফেলতে পারো, তবেই সেটি জাদুর মতো ৭৯ প্রোটনের সোনায় পরিণত হবে!
১৯৪১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানী প্রথমবারের মতো এই অসাধ্য সাধন করেন। তাঁরা একটি কণা ত্বরক যন্ত্র ব্যবহার করে পারদের পরমাণুর ওপর লিথিয়াম ও ডিউটেরিয়াম নিউক্লিয়াসের গোলাবর্ষণ করেন। উচ্চ শক্তির এই কণাগুলোর আঘাতে পারদের নিউক্লিয়াস থেকে প্রোটন ছিটকে বেরিয়ে যায় এবং তা সোনায় পরিণত হয়! তবে সেই সোনা ছিল তেজস্ক্রিয় এবং তা খুব দ্রুতই আবার ভেঙে যায়।
এরপর ১৯৮০–এর দশকে ক্যালিফোর্নিয়ার লরেন্স বার্কলি ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে নোবেলজয়ী রসায়নবিদ গ্লেন সিবর্গ এই জাদুর পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি বিসমাথ (যার প্রোটন ৮৩টি) ধাতুর পরমাণুকে কার্বন ও নিয়ন নিউক্লিয়াস দিয়ে প্রায় আলোর গতিতে আঘাত করে কয়েক হাজার পরমাণুকে সোনায় রূপান্তর করেছিলেন!
ক্যাপসুল ও প্যারাসুট দিয়ে কেন মহাকাশ থেকে ফিরতে হয়?তিন
এতটা পড়ার পরে তোমার মাথায় প্রশ্ন আসবে, তাহলে সবাই কেন সোনা বানিয়ে বড়লোক হচ্ছে না? বর্তমানে সার্নের লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে বিজ্ঞানীরা সিসার আয়নগুলোকে আলোর কাছাকাছি গতিতে একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটাচ্ছেন। এই প্রচণ্ড সংঘর্ষে সিসার প্রোটন ও নিউট্রনগুলো পুরোপুরি গলে গিয়ে কোয়ার্ক গ্লুয়ন প্লাজমা নামের এক অদ্ভুত অবস্থায় চলে যায়, যা বিগ ব্যাংয়ের ঠিক পরের মুহূর্তের মতো!
তবে মুখোমুখি সংঘর্ষ না হয়ে যখন দুটি কণা একে অপরের খুব কাছ দিয়ে তীব্র বেগে ঘেঁষে বেরিয়ে যায়, তখন সেখানে বিশাল তড়িৎচৌম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি হয়। এই বলের ধাক্কায় সিসার নিউক্লিয়াস থেকে প্রোটন ছিটকে বেরিয়ে যায় এবং সিসা সোনায় পরিণত হয়। এভাবেই টানা তিন বছর পরীক্ষা চালিয়ে কালওয়েটের দল সিসা থেকে প্রায় ২৯ ট্রিলিয়ন ভাগের ১ গ্রাম সোনা তৈরি করতে পেরেছিলেন!
এখন তোমার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, বিজ্ঞানীরা যদি সোনা বানাতেই পারেন, তবে তো সারা দিন মেশিনে সোনা বানিয়ে বিলিয়নিয়ার হয়ে যাওয়ার কথা!
আসল সমস্যা হলো খরচ। সার্নের মতো একটি বিশাল পার্টিকেল অ্যাকসিলারেটর বানানো ও চালানোর খরচ অকল্পনীয়। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, বিজ্ঞানী গ্লেন সিবর্গ আশির দশকে বিসমাথ থেকে যে সামান্য সোনা তৈরি করেছিলেন, সেই সোনা বানানোর মেশিনের পেছনে তাঁর যে বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খরচ হয়েছিল, তা ওই উৎপন্ন সোনার বাজারদরের চেয়ে প্রায় এক ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি গুণ বেশি! তা ছাড়া কোটি কোটি ডেটা থেকে মাত্র কয়েকটা সোনার পরমাণু খুঁজে বের করা খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার চেয়ে কঠিন।
অর্থাৎ লোহা বা সিসাকে সোনায় রূপান্তর করাটা বিজ্ঞানের খাতায় ১০০ ভাগ সম্ভব হলেও বাস্তবে এটি পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে লস ব্যবসা হবে! ১০০ কোটি টাকা খরচ করে ১০ হাজার টাকার সোনা বানিয়ে তো কোনো লাভ নেই, তাই না?
সূত্র: লাইভ সায়েন্স
মৃত তিমির পেটে পাওয়া গেছে ৬ কোটি টাকার ‘সোনা’