ইরান যুদ্ধ: সার্বভৌমত্বের সীমা এবং ছোট রাষ্ট্রগুলোর চ্যালেঞ্জ

· Prothom Alo

ইরাক থেকে লিবিয়া, ভেনেজুয়েলা থেকে ইউক্রেন এবং এখন ইরানের উদাহরণ থেকে একটি সত্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে একবিংশ শতাব্দীতে সার্বভৌমত্ব আর নিঃশর্ত নয়। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সার্বভৌমত্বের সীমা এবং ছোট রাষ্ট্রগুলোর চ্যালেঞ্জ নিয়ে লিখেছেন গোলাম রসুল

Visit raccoongame.org for more information.

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলা শুধু একটি সামরিক ঘটনা নয়; এটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একটি মৌলিক ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব—যে নীতির ওপর আধুনিক বিশ্বরাজনীতি দাঁড়িয়ে, তা বাস্তবে কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক আইনে সব রাষ্ট্র সমান হলেও বাস্তবে শক্তিধর রাষ্ট্র সীমান্ত অতিক্রম করে আঘাত হানতে পারে এবং সেই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গভীর বৈপরীত্যকে প্রকাশ করে।

জাতিসংঘ বলেছিল, বলপ্রয়োগ হবে ব্যতিক্রম, আইন থাকবে শক্তির ঊর্ধ্বে। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, এই নীতি কখনোই সমানভাবে কার্যকর হয়নি। শক্তিধর রাষ্ট্র প্রয়োজনে আইনকে পাশ কাটিয়েছে, নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী ব্যাখ্যা করেছে। ইরানের ওপর হামলা সেই ধারাবাহিকতার সাম্প্রতিক উদাহরণ, যা স্পষ্ট করে দেয় একবিংশ শতাব্দীতে সার্বভৌমত্ব আর নিঃশর্ত নয়; এটি শক্তির ভারসাম্যের মধ্যে টিকে থাকা এক শর্তাধীন বাস্তবতা।

  • সার্বভৌমত্ব আজ শক্তির ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল। আইন সমতার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে শক্তিই নির্ধারণ করছে কোন রাষ্ট্র স্বাধীন থাকবে, আর কোন রাষ্ট্র শর্তাধীন অবস্থায় টিকে থাকবে।

  • ছোট রাষ্ট্রগুলোকে প্রায়ই কৌশলগত সমন্বয় করতে হয়। এ বাস্তবতায় তারা অনেক সময় সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বড় শক্তির স্বার্থের সঙ্গে নিজস্ব অবস্থান সামঞ্জস্য করতে বাধ্য হয়।

  • একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক রাজনীতির বড় প্রশ্ন হলো, আইন কি শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, নাকি শক্তিই শেষ পর্যন্ত নিয়ম লিখতে থাকবে?

সার্বভৌমত্বের ধারণা ও বাস্তবতা

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সার্বভৌমত্বের ধারণার সূচনা হয় ১৬৪৮ সালের ‘পিস অব ওয়েস্টফালিয়া’র মাধ্যমে। এর মূলনীতি ছিল সরল—রাষ্ট্রগুলো সমান, তাদের সীমানা অখণ্ড এবং বাইরের হস্তক্ষেপ অগ্রহণযোগ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উপনিবেশমুক্তির ঢেউয়ে নতুন রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রবেশ করলে এই নীতি বৈশ্বিক রূপ পায়। জাতিসংঘ সনদ রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে আইনি স্বীকৃতি দেয় এবং বলপ্রয়োগকে কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ করে।

তবে ইতিহাস দেখায়, সার্বভৌমত্বের নীতি কখনোই সমানভাবে কার্যকর হয়নি। শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছে। আর শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মানবিক হস্তক্ষেপ, গণতন্ত্র রক্ষার নামে আগ্রাসন এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মতো নীতিগুলো সার্বভৌমত্বকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। একসময় এটি ছিল নিঃশর্ত অধিকার; এখন এটি অনেকটাই শর্তাধীন।

গত তিন দশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সার্বভৌমত্বের ধারণায় একটি মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’ এবং রেসপনসিবিলিটি টু প্রটেক্ট’–এর মতো নীতিগুলো বলছে, সার্বভৌমত্ব কেবল অধিকার নয়, এটি দায়িত্বও। যদি কোনো রাষ্ট্র নিজ নাগরিকদের গণহত্যা, জাতিগত নিধন বা মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হস্তক্ষেপ করতে পারে।

নীতিগতভাবে এই ধারণা নৈতিক অগ্রগতি বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, ব্যর্থতার সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করে? কোন সংকটে হস্তক্ষেপ হবে আর কোনটিতে হবে না—সেই সিদ্ধান্তের মানদণ্ড কী? আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তববাদী ব্যাখ্যা বলছে, এসব সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ ও কৌশলগত অগ্রাধিকারের ওপর নির্ভর করে।

গোলাম রসুল

ফলাফল হলো ‘সিলেকটিভ’ বা বেছে বেছে প্রয়োগ। কিছু ক্ষেত্রে মানবিক সংকট দ্রুত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ ডেকে আনে, আবার অন্য ক্ষেত্রে সমান বা বৃহত্তর সংকটেও নীরবতা দেখা যায়। নীতি তাই সর্বজনীন হলেও প্রয়োগ হয় অসমভাবে।

এই প্রক্রিয়ায় সার্বভৌমত্বের চরিত্র বদলে গেছে। আগে এটি ছিল ভৌগোলিক অখণ্ডতার অবিচ্ছেদ্য অধিকার; এখন এটি হয়ে উঠেছে শর্তসাপেক্ষ স্বীকৃতি—যেখানে বৈধতা, আচরণ ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান স্বাধীনতার পরিসর নির্ধারণ করে। অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব আর কেবল আইনগত মর্যাদা নয়; এটি আন্তর্জাতিক শক্তির কাঠামোর মধ্যে টিকে থাকা এক রাজনৈতিক বাস্তবতা।

ইরানে হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ইরাক, লিবিয়া, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেন—প্রতিটি ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্ব ভিন্নভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। এসব উদাহরণ দেখায়, আন্তর্জাতিক আইন ও সমতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে শক্তির ভারসাম্যের কাছে কতটা দুর্বল হয়ে পড়ে।

ইরাক (২০০৩): যুক্তরাষ্ট্র গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অজুহাতে ইরাকে হামলা অর্থাৎ সামরিক আগ্রাসন চালায়। জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে একতরফা সামরিক অভিযান ইরাকের সার্বভৌমত্বকে ভঙ্গুর করে তোলে। আইনগতভাবে ইরাক স্বাধীন থাকলেও বাস্তবে সামরিক শক্তির কাছে তা ভেঙে পড়ে।

লিবিয়া (২০১১): ন্যাটো তথাকথিত মানবিকতার ভাষায় রেসপনসিবিলিটি টু প্রটেক্ট’ নীতির নামে লিবিয়ায় হস্তক্ষেপ করে। তাদের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল নাগরিকদের রক্ষা করা। কিন্তু ফলাফল হয় শাসনব্যবস্থার পতন ও দীর্ঘস্থায়ী অরাজকতা। মানবিকতার ভাষা ব্যবহার করে সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করা হয়েছিল।

ভেনেজুয়েলা (চলমান): ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করার প্রক্রিয়া বহুমাত্রিক। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেশটিকে বৈশ্বিক বাজার থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করেছে; ফলে স্বাধীন অর্থনৈতিক নীতি প্রয়োগের ক্ষমতা সীমিত হয়েছে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্র দেখিয়েছে যে সার্বভৌমত্ব শুধু অর্থনৈতিক চাপেই নয়, সরাসরি সামরিক শক্তির মাধ্যমেও ভঙ্গুর হতে পারে।

 ইউক্রেন (২০২২–বর্তমান): রাশিয়ার আগ্রাসন ইউক্রেনের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ভেঙে দেয়। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক সহায়তা সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করে। ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব এখানে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির মধ্যে টানাপোড়েনের শিকার। একদিকে রাশিয়ার চাপ, অন্যদিকে পশ্চিমা সমর্থন। ফলে ইউক্রেনের স্বাধীনতা হয়ে উঠেছে শর্তাধীন।

ওপরের উদাহরণগুলো থেকে বার্তাটি স্পষ্ট। সার্বভৌমত্ব আজ শক্তির ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল। আইন সমতার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে শক্তিই নির্ধারণ করছে কোন রাষ্ট্র স্বাধীন থাকবে, আর কোন রাষ্ট্র শর্তাধীন অবস্থায় টিকে থাকবে।

ইরান: শক্তি, নিষেধাজ্ঞা ও সার্বভৌমত্বের সংকোচন 

ইরান আজ শর্তাধীন সার্বভৌমত্বের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। আইনগতভাবে ইরান একটি সমান মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্র। কিন্তু বাস্তবে তার অর্থনৈতিক প্রবেশাধিকার সীমিত, সামরিক চাপ অব্যাহত এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রায়ই অচল। অর্থাৎ আইনি মর্যাদা থাকলেও কাঠামোগত ক্ষমতা সীমিত। ফলে সার্বভৌমত্ব অস্তিত্বগতভাবে অস্বীকার করা হয়নি, কিন্তু কার্যকরভাবে সংকুচিত হয়েছে।

অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা: দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের তেল রপ্তানি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক লেনদেন ভীষণভাবে সীমিত হয়েছে। ডলারভিত্তিক বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো থেকে আংশিক বিচ্ছিন্নতা একটি রাষ্ট্রের নীতিগত স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে। আইনগতভাবে ইরান একটি সমান মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্র। কিন্তু অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরে তার কার্যকর ক্ষমতা সীমিত।

প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থা: জাতিসংঘর কাঠামোয় নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো রাজনীতি প্রায়ই সমষ্টিগত পদক্ষেপকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে আইনগত সমতা থাকলেও সেই সমতার বাস্তব প্রয়োগ নির্ভর করে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর অবস্থানের ওপর।

সব মিলিয়ে বার্তাটি স্পষ্ট। সার্বভৌমত্ব আজ আর নিঃশর্ত নয়। আইন সমতার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে শক্তিই নির্ধারণ করছে কোন রাষ্ট্র স্বাধীন থাকবে আর কোন রাষ্ট্র শর্তাধীন অবস্থায় টিকে থাকবে। এই বাস্তবতা দেখায়—একবিংশ শতাব্দীতে সার্বভৌমত্ব সামরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক প্রবেশাধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনের সমন্বয়ে নির্ধারিত এক রাজনৈতিক বাস্তবতা।

ছোট রাষ্ট্রগুলোর চ্যালেঞ্জ

আজকের বিশ্বব্যবস্থায় ছোট ও মধ্যম আকারের রাষ্ট্রগুলোই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। তাদের জন্য সার্বভৌমত্ব কোনো অটুট ঢাল নয়; বরং এটি টিকে থাকে অর্থনৈতিক সক্ষমতা, কৌশলগত ভারসাম্য এবং দক্ষ কূটনীতির ওপর।

বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এই বাস্তবতা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের অর্থনীতি বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত; পোশাক রপ্তানি নির্ভর করে পশ্চিমা বাজারের ওপর, রেমিট্যান্স নির্ভর করে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের ওপর আর জলবায়ু অভিযোজন নির্ভরশীল আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর। ফলে বৈশ্বিক শক্তির রাজনীতির পরিবর্তন আমাদের অর্থনীতি ও কূটনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

অর্থনৈতিকভাবে ছোট রাষ্ট্রগুলো প্রায়ই সীমিত রপ্তানি খাত, নির্দিষ্ট বাজার এবং জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৈশ্বিক উত্তেজনা, নিষেধাজ্ঞা নীতি বা বাণিজ্যিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তন তাদের অর্থনীতিকে দ্রুত অস্থির করে তুলতে পারে। একইভাবে প্রবাসী আয়, বৈদেশিক বিনিয়োগ বা আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা তাদের আর্থিক স্থিতিকে সহজেই ভঙ্গুর করে তোলে।

রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল। বড় শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ছোট রাষ্ট্রগুলোকে প্রায়ই কৌশলগত সমন্বয় করতে হয়। এই বাস্তবতায় তারা অনেক সময় সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বড় শক্তির স্বার্থের সঙ্গে নিজস্ব অবস্থান সামঞ্জস্য করতে বাধ্য হয়।

ইরাক থেকে লিবিয়া, ভেনেজুয়েলা থেকে ইউক্রেন এবং এখন ইরানের উদাহরণ থেকে একটি সত্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে একবিংশ শতাব্দীতে সার্বভৌমত্ব আর নিঃশর্ত নয়। আন্তর্জাতিক আইন রাষ্ট্রসমতার কথা বলে; কিন্তু বাস্তবে শক্তির অসম বণ্টনই স্বাধীনতার সীমা নির্ধারণ করে। আইনি মর্যাদা টিকে থাকে; কার্যকর স্বাধীনতা নির্ভর করে ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর।

কখনো আন্তর্জাতিক সংস্থায় ভোটের সময় বড় শক্তির অবস্থানকে সমর্থন করতে হয়। কখনো নিরাপত্তা সহযোগিতার অংশ হিসেবে সামরিক ঘাঁটি বা কৌশলগত প্রবেশাধিকার দিতে হয়। আবার কখনো বাণিজ্যনীতি, আর্থিক বিধিনিষেধ বা বিনিয়োগ নীতিতে আপস করতে হয়, যাতে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক অটুট থাকে।

এই সিদ্ধান্তগুলো সব সময় স্বেচ্ছায় নেওয়া হয় না; অনেক সময় এগুলো হয় কাঠামোগত চাপের ফল। অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব আইনে অক্ষুণ্ন থাকলেও বাস্তবে তার পরিসর সংকুচিত হয়ে যায়।

ফলে ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য সার্বভৌমত্ব কেবল আইনি মর্যাদা নয়; এটি হয়ে ওঠে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের শিল্প—যেখানে বড় শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক কতটা দক্ষভাবে সামলানো যায়, তার ওপরই স্বাধীনতার বাস্তব পরিসর নির্ভর করে। ভুল ভারসাম্য বা অতিরিক্ত নির্ভরতা দ্রুত কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক ক্ষতি কিংবা নিরাপত্তাঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।

সব মিলিয়ে শিক্ষা স্পষ্ট। একবিংশ শতাব্দীতে ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য সার্বভৌমত্ব আর নিছক ঢাল নয়—এটি টিকে থাকার কৌশল। আজকের বিশ্বে এক গভীর বৈপরীত্য কাজ করছে। আন্তর্জাতিক আইনে সব রাষ্ট্র সমান; কিন্তু বাস্তবে শক্তির অসম বণ্টনই স্বাধীনতার পরিসর নির্ধারণ করে। বড় শক্তিগুলো সীমানা পেরিয়ে প্রভাব বিস্তার করতে পারে; ছোট রাষ্ট্রগুলোকে প্রতিদিন ভারসাম্য রক্ষা করে টিকে থাকতে হয়।

ইরান ইস্যু সেই বাস্তবতাকে উন্মোচন করেছে। এটি শুধু একটি দেশের সংকট নয়; এটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কাঠামোগত সত্যের প্রতিচ্ছবি; আইন সমতার ভাষা বলে, শক্তিসীমা নির্ধারণ করে।

এখন প্রশ্ন তাত্ত্বিক নয়, অস্তিত্বগত। আইন কি সত্যিই শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, নাকি শক্তিই নিয়ম লিখতে থাকবে? যদি এই বৈষম্য অমীমাংসিত থাকে, তবে সার্বভৌমত্ব কাগজে সর্বজনীন থাকবে, বাস্তবে শর্তাধীনই থাকবে। একুশ শতকের বিশ্বব্যবস্থার চরিত্র নির্ধারিত হবে এই উত্তরের মাধ্যমে। আর ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য এটি দর্শনের বিতর্ক নয়; এটি অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং টিকে থাকার প্রশ্ন।

ইরাক থেকে লিবিয়া, ভেনেজুয়েলা থেকে ইউক্রেন এবং এখন ইরানের উদাহরণ থেকে একটি সত্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে একবিংশ শতাব্দীতে সার্বভৌমত্ব আর নিঃশর্ত নয়। আন্তর্জাতিক আইন রাষ্ট্রসমতার কথা বলে; কিন্তু বাস্তবে শক্তির অসম বণ্টনই স্বাধীনতার সীমা নির্ধারণ করে। আইনি মর্যাদা টিকে থাকে; কার্যকর স্বাধীনতা নির্ভর করে ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর।

অতএব প্রশ্নটি কেবল নীতিগত নয়, কাঠামোগতভাবে বিশ্বব্যবস্থা কি সত্যিই সমতার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে, নাকি এটি এমন এক শ্রেণিবিন্যাস, যেখানে কিছু রাষ্ট্র নিয়ম লেখে আর অন্যরা সেই নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য হচ্ছে?

ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য বার্তাটি কঠিন, কিন্তু স্পষ্ট। সার্বভৌমত্ব রক্ষা মানে শুধু সীমান্ত পাহারা নয়; এর অর্থ অর্থনৈতিক স্থিতি জোরদার করা, বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো। কৌশলগত ভারসাম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততাই টিকে থাকার বাস্তব শর্ত।

শেষ পর্যন্ত বাস্তবতাটি অস্বস্তিকর, কিন্তু স্পষ্ট। সার্বভৌমত্ব কাগজে সমান, কিন্তু বাস্তবে শক্তির কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। আইন সমতার প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু শক্তিই প্রায়ই তার সীমানা নির্ধারণ করে। তাই একুশ শতকের আন্তর্জাতিক রাজনীতির বড় প্রশ্ন হলো, আইন কি শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, নাকি শক্তিই শেষ পর্যন্ত নিয়ম লিখতে থাকবে?

ড. গোলাম রসুল অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা।

ই-মেইল: [email protected]

* মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source