ফ্রান্সে রমজান: ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে সংযম, সমাজ ও বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতা

· Prothom Alo

ইউরোপের ব্যস্ত নগরজীবনের মধ্যেও রমজান এসে হাজির হয় এক নীরব আধ্যাত্মিকতার আবহ নিয়ে। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে যখন বসন্তের আলো একটু একটু করে দীর্ঘ হয়, তখনই মুসলিম সম্প্রদায়ের জীবনে শুরু হয় সংযম, আত্মশুদ্ধি ও ধর্মীয় অনুশীলনের এক বিশেষ সময়। বিশ্বের অন্যতম ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ফ্রান্সে রমজানের অভিজ্ঞতা তাই কেবল ধর্মীয় আচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি সামাজিক সহাবস্থান, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও প্রবাসী পরিচয়ের এক বাস্তব প্রতিফলন।

ফ্রান্সে মুসলমানদের উপস্থিতি দীর্ঘ ইতিহাসের ফল। উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়া, মরক্কো ও তিউনিসিয়া থেকে আসা অভিবাসীদের পাশাপাশি তুরস্ক, পশ্চিম আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকেও বিপুল সংখ্যক মুসলমান এখানে বসবাস করেন। ফলে রমজান এলেই এই ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের জীবনযাপন যেন এক অদৃশ্য সুতোয় গাঁথা হয়ে যায়। ভাষা, পোশাক কিংবা খাদ্যসংস্কৃতিতে পার্থক্য থাকলেও রোজা, ইফতার ও তারাবির মধ্য দিয়ে সবাই একটি অভিন্ন আধ্যাত্মিক অনুভূতির অংশ হয়ে ওঠেন।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

ফ্রান্সের রাষ্ট্রব্যবস্থা কঠোর ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিতে পরিচালিত, যা ফরাসি ভাষায় লা-ইসিতে নামে পরিচিত। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য রাষ্ট্র ও ধর্মকে পৃথক রাখা এবং সকল নাগরিকের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করা। তাই রমজানের সময় সরকারি জীবন বা প্রশাসনিক কার্যক্রমে তেমন কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যায় না। অফিস, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান—সবকিছুই স্বাভাবিক গতিতে চলে। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতার ভেতরেই মুসলিম নাগরিকেরা তাঁদের ধর্মীয় অনুশীলন চালিয়ে যান ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিসরে।

ইউরোপে রমজানের আরেকটি বিশেষ বাস্তবতা হলো দিনের দীর্ঘতা। গ্রীষ্মের কাছাকাছি সময়ে ফ্রান্সে রোজার সময় অনেক দীর্ঘ হয় কখনো কখনো ১৬ ঘণ্টার বেশি। ভোরের সাহ্‌রি শেষ করতে হয় গভীর রাতে, আবার ইফতার করতে করতে রাত নেমে আসে অনেক পরে। কাজ, পড়াশোনা কিংবা দৈনন্দিন ব্যস্ততার মাঝেও এই দীর্ঘ সময় সংযম পালন করা অনেকের জন্য একটি বড় আত্মনিয়ন্ত্রণের অনুশীলন হয়ে ওঠে। তবু রমজানের দিনগুলো ধীরে ধীরে মানুষকে একটি নতুন ছন্দে অভ্যস্ত করে তোলে।

জাপানে পবিত্র মাহে রমজান এবং ঈদের আনন্দ

রমজানের সবচেয়ে প্রাণবন্ত দৃশ্যগুলোর একটি দেখা যায় প্যারিসের অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে। সন্ধ্যার আগে আগে বাজারগুলোতে হঠাৎ ভিড় বেড়ে যায়। অফিস শেষে মানুষ দ্রুত বাজারের দিকে ছুটে আসে কারও হাতে বাজারের তালিকা, কেউ আবার শেষ মুহূর্তে ইফতারের জন্য বিশেষ কিছু কিনতে ব্যস্ত।

লা শাপেল, বারবেস, সাঁ-দেনি কিংবা ওবারভিলিয়ে—এই এলাকাগুলোতে হাঁটলে বোঝা যায় রমজান যেন শহরের ভেতরে আরেকটি শহর তৈরি করেছে। রাস্তাজুড়ে দোকানের সামনে সাজানো থাকে খেজুরের স্তূপ, শুকনো ফল, নানা রকম মসলা ও মধ্যপ্রাচ্যের মিষ্টান্ন। কোথাও আরবি বাকলাভা, কোথাও তুর্কি লোকুম, আবার কোথাও দক্ষিণ এশীয় মিষ্টির ট্রে। গরম তেলে ভাজা সমুচা কিংবা পাকোড়ার গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে যেন এক আন্তর্জাতিক ইফতার বাজারের আবহ তৈরি হয়।

বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় দোকানগুলোতে তখন বিশেষ ব্যস্ততা দেখা যায়। বেগুনি, আলুর চপ,পাকোড়া, ছোলা, জিলাপি কিংবা পেঁয়াজুসহ হরেক রকম পদ। এসব খাবার অনেক প্রবাসীর কাছে দেশের স্বাদ ফিরিয়ে আনে। অনেক দোকান ইফতারের আগে আগে বিশেষ রমজানি প্যাকেটও প্রস্তুত করে রাখে, যাতে খেজুর, ফল, ভাজাপোড়া ও মিষ্টি একসঙ্গে পাওয়া যায়।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
দূর দেশে রোজা–ইফতার–তারাবিহ যেমন

অন্যদিকে উত্তর আফ্রিকার মুসলমানদের ঘরে ইফতারের প্রধান আকর্ষণ থাকে ঐতিহ্যবাহী হরিরা স্যুপ। টমেটো, ডাল, ছোলা ও মাংস দিয়ে তৈরি এই স্যুপ মরক্কো ও আলজেরিয়ায় রমজানের অপরিহার্য খাবার হিসেবে পরিচিত। তুর্কি পরিবারগুলো ইফতারের জন্য বানায় গরম পিদে রুটি, যা সাধারণত খেজুর, জলপাই বা পনিরের সঙ্গে খাওয়া হয়। পশ্চিম আফ্রিকার মুসলমানদের টেবিলে আবার থাকে সুগন্ধি মশলায় রান্না করা মাংস, ভাত বা কুসকুসের মতো খাবার।

প্যারিসের কিছু মসজিদ ও সামাজিক সংগঠন রমজান উপলক্ষে উন্মুক্ত ইফতারের আয়োজনও করে থাকে। সেখানে প্রবাসী শ্রমিক, শিক্ষার্থী কিংবা পথচারীরাও অংশ নিতে পারেন। অনেক সময় অমুসলিম প্রতিবেশীরাও এই ইফতার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হন, যা ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে।

ইফতারের পর শহরের আরেকটি দৃশ্য ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয় মসজিদমুখী মানুষের স্রোত। প্যারিসের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড মসজিদ প্যারিসসহ বিভিন্ন মসজিদে এই সময় মুসল্লিদের ভিড় বেড়ে যায়। রাতের তারাবির নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত এবং ধর্মীয় আলোচনায় মসজিদগুলো যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়। তরুণদের উপস্থিতিও সেখানে বিশেষভাবে চোখে পড়ে।

কাতারে রমজান মাসের ইফতারে ফিরে আসে ঐতিহ্যের খাবার

তবে প্রবাসে রমজানের অভিজ্ঞতা সব সময় আনন্দময় নয়, এতে একটি সূক্ষ্ম নিঃসঙ্গতাও থাকে। পরিবার থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা শিক্ষার্থী বা কর্মজীবী অনেক মানুষের কাছে ইফতারের সময়টি দেশের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। বাংলাদেশের বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে বসে ইফতার করা, মসজিদের মাইকে আজানের ধ্বনি, কিংবা রান্নাঘরের ব্যস্ততা—এসব স্মৃতি তখন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আধুনিক প্রযুক্তি সেই দূরত্ব কিছুটা কমিয়ে দেয় ভিডিও কলের মাধ্যমে অনেকেই পরিবারের সঙ্গে মুহূর্তগুলো ভাগ করে নেন।

ফ্রান্সের বহুসাংস্কৃতিক সমাজে রমজান কখনো কখনো ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে সংলাপের সুযোগও তৈরি করে। অনেক অমুসলিম সহকর্মী বা প্রতিবেশী রোজার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে আগ্রহ দেখান। কেউ কেউ ইফতারের সময় শুভেচ্ছা জানান কিংবা রোজাদারদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন। এই ছোট ছোট সামাজিক আচরণগুলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করে।

খিম্পো শহরের ইজেন বাইতুল আমান মসজিদে এক অনন্য উদ্যোগ

রমজানের শেষদিকে যখন ঈদের প্রস্তুতি শুরু হয়, তখন প্রবাসী মুসলিম সমাজে একধরনের উৎসবের আবহ তৈরি হয়। নতুন পোশাক কেনা, মিষ্টান্ন প্রস্তুত করা ও ঈদের নামাজের প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে প্যারিসের মুসলিম এলাকাগুলোতে আনন্দের সুর শোনা যায়। ঈদের সকালে মসজিদ ও খোলা মাঠে হাজার হাজার মানুষ একত্রিত হয়ে নামাজ আদায় করেন, একে অপরকে আলিঙ্গন করেন ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

সব মিলিয়ে ফ্রান্সে রমজান কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাস নয়, এটি সংযমের অনুশীলন, সামাজিক সংহতির প্রতিফলন ও বহুসাংস্কৃতিক সহাবস্থানের এক জীবন্ত বাস্তবতা। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যেও মুসলমানরা তাদের আধ্যাত্মিক জীবনধারা ধরে রাখেন, আবার একই সঙ্গে বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের পথ তৈরি করেন।

প্যারিসের ব্যস্ত নগরজীবনের ভেতর তাই রমজান যেন এক নীরব অথচ গভীর অভিজ্ঞতা—যেখানে সংযম, বিশ্বাস ও বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতা মিলেমিশে এক অনন্য সামাজিক ও আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করে।

নিদ্রিত নগরীর হৃৎস্পন্দন, কায়রোর রমজানে মেসহারাতির অমর ডাক

Read full story at source