হাজারের বেশি লাশের ময়নাতদন্ত করেছেন ডা. মমতাজ, পড়ুন তাঁর অভিজ্ঞতা

· Prothom Alo

ময়নাতদন্তের জন্য আনা হয়েছে দুটো হাত।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

‘দেখেই বুঝেছি, ভিকটিমের বয়স ৩০-৩৫ হবে। আমি ডিউটিতে ছিলাম, তাই হাতের ময়নাতদন্ত আমি করেছি। শরীরের অন্য অংশগুলো যখন পাওয়া যাবে, তখন হয়তো অন্য কোনো চিকিৎসকের ডিউটি থাকবে। তিনি দেখবেন।’

বর্ণনা শুনে আমাদের বুক কাঁপল। কিন্তু সহযোগী অধ্যাপক ডা. মমতাজ আরার গলা কাঁপল না একটুও। গত ১৫ বছরে এক হাজারের বেশি ময়নাতদন্ত করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের এই ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। যে দৃঢ়তা আমরা তাঁর চোখেমুখে দেখি, আদতে তা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার যোগফল।

ফরেনসিক মেডিসিনেই কেন

রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস শেষে ডা. মমতাজ আরা তখন গাজীপুরের তায়রুননেছা মেমোরিয়াল মেডিকেল কলেজের প্রভাষক। সেখানে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ছিলেন অধ্যাপক বিভূতিভূষণ সরকার। ‘চেনেন তো? মনোরোগবিশেষজ্ঞ মেখলা সরকারের বাবা,’ বলছিলেন মমতাজ। ‘স্যারই বললেন, “তুমি ফরেনসিকে পোস্টগ্র্যাজুয়েশনটা করো।” আমি বললাম, স্যার, গাইনিতে ভর্তি হই, মেয়েদের জন্য তো গাইনিটাই ভালো। স্যার বললেন, “না, ফরেনসিকে অনেক সাহস লাগে, তুমি পারবা।” আমার ওপর স্যারের অগাধ বিশ্বাস।’

প্যারাসিটামল নিয়ে যা জানা উচিত

২০০৯ সালে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ‘ডিপ্লোমা ইন ফরেনসিক মেডিসিন’ কোর্সে ভর্তি হন ডা. মমতাজ। কাজ করতে করতেই উপলব্ধি করেন, কেন এই বিভাগে নারী চিকিৎসকের অংশগ্রহণ আরও বেশি দরকার।

‘ফরেনসিক মানে তো শুধু পোস্টমর্টেম (ময়নাতদন্ত) নয়। বিভিন্ন মেডিকোলিগ্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে। যেমন রেপ ভিকটিম এক্সামিনেশন, এজ ডিটারমিনেশন (বয়স নির্ধারণ), সেক্স ডিটারমিনেশন (লিঙ্গ নির্ধারণ), পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণ ইত্যাদি। ভিকটিম যদি নারী হয়, নারী চিকিৎসককেই তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়। এ বিষয়ে হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা আছে। সমস্যা হলো, বাংলাদেশে মেডিকেল কলেজে ও জেলা সদর হাসপাতালে নারী ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম,’ বলেন মমতাজ।

ডিপ্লোমা চলাকালেই বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ডা. মমতাজ। তত দিনে অবশ্য বুঝতে পারছিলেন, বিসিএসের পরই আদতে আসল পরীক্ষার শুরু।

১৫ বছরে এক হাজারের বেশি ময়নাতদন্ত করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের এই ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

‘চেনেন আমাকে?’

প্রথম পোস্টিং নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলায়। সেখানে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আহত ব্যক্তিদের সনদ দেওয়া। মারামারি করে সামান্য আঘাত নিয়ে হাজির হয়েও অনেকে তদবির করতেন, রিপোর্টে বড় আঘাতের কথা লিখতে হবে। প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর জন‍্যই এসব ফন্দিফিকির।

সেই থেকে হুমকি, পারিপার্শ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অভ্যস্ত হয়ে গেছেন ডা. মমতাজ। কেউ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন উল্টে দিতে বলে, কেউ চোখ পাকিয়ে বলে, ‘চেনেন আমাকে? জানেন আমি কে?’

হ্যাঁ, এসবের মধ্য দিয়েই ডা. মমতাজ চিনেছেন-জেনেছেন; তবে নিজেকে। সেই সঙ্গে আশপাশের রূঢ় বাস্তবতাকে। বলছিলেন, ‘আমি আসলে একটু কঠিন টাইপের মানুষ। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যা পাই, সেটাই রিপোর্টে লিখি। এতে হয়তো কারও কারও অসুবিধা হয়। কিন্তু আমি সব সময় রিপোর্ট দ্রুত দেওয়ার চেষ্টা করি।’

তেহরানে থাকা বাংলাদেশির অভিজ্ঞতা: আকাশের দিকে তাকালে দেখা যায়, একের পর এক মিসাইল ছুটে যাচ্ছে

কঠিনেরে ভালোবাসিলাম

২০১৯ সালের চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ড থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান—বহু তাৎপর্যপূর্ণ সময়ে মর্গের ডিউটিতে ছিলেন মমতাজ আরা। আগুনে পোড়া লাশ, পচে-গলে যাওয়া মৃতদেহ কিংবা স্রেফ কঙ্কাল—কত কিছু নিয়ে যে কাজ করতে হয় প্রতিনিয়ত! কখনো ভয় করেনি?

মমতাজ বলেন, ‘না। ভয়টা আসলে মেডিকেলের প্রথম বর্ষেই কেটে যায়।’

একটা ঘটনার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করলেন। ‘বেশ কয়েক মাস আগের কথা। মর্গে আনা হলো ছোট্ট, ফুটফুটে একটা মেয়েকে। বয়স পাঁচ-ছয় বছর হবে। সারা গায়ে আঘাতের চিহ্ন। পরে জেনেছি, মেয়েটির মা-বাবা কেউ নেই। কোনো এক আত্মীয়ের কাছে থাকত। হয়তো তাদের “বোঝা” হয়ে গিয়েছিল। মুখটা আমার এখনো মনে পড়ে। আবার অনেক সময় দেখা যায়, একজন মানুষের ময়নাতদন্ত করছি, তাঁর ভেতরে পাওয়া গেল আরও একজন। দারিদ্র্য বা দাম্পত্য কলহের কারণে কোনো সন্তানসম্ভবা আত্মহত্যা করেছেন।’

ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের চ্যালেঞ্জ থাকে নানা রকম। ঝুঁকি তো আছেই, তার ওপর সাক্ষ্য দিতে ছুটতে হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের জেলা আদালতে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নটা মাথায় এল—কখনো কি আক্ষেপ হয়, কেন এই পেশায় এলাম?

‘নাহ্‌,’ মমতাজের উত্তর। ‘আমি ভাগ্যে বিশ্বাসী। ভাগ্যে হয়তো এটাই ছিল। আমি সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে চলতে পছন্দ করি। তা ছাড়া আমার কাজের সুবাদে কেউ যদি ন্যায়বিচার পান, সেটুকুই আমার আনন্দ। কত মানুষ ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় থাকে। একবার...সম্ভবত বাড্ডা থানার একটা কেসে সাক্ষ্য দিতে গিয়েছিলাম। এক বৃদ্ধ মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, “মা, আপনার জন্য অনেক দোয়া করি। আপনি যার পোস্টমর্টেম করেছেন, সে আমার ছেলে।”’

মর্গে ডিউটি থাকলে এই ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ সব সময় মনে মনে বলেন, আজ অন্তত কোনো লাশ না আসুক।

কিন্তু তাঁর দীর্ঘ চাকরিজীবনে এই ‘ছোট্ট’ চাওয়া কখনো পূরণ হয়নি।

Read full story at source