সেদিন প্রভাতফেরির ভিড়ে জহির রায়হানের গোপন শুটিং অভিযান
· Prothom Alo

চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, বাংলা ভাষা, গণ-আন্দোলন আর স্বাধীনতার স্বপ্ন—এই তিনটি শব্দকে একসূত্রে বেঁধে যে চলচ্চিত্রটি আজও অনিবার্য হয়ে আছে, তার নাম ‘জীবন থেকে নেয়া’। একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরি, শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া আর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের কোরাস—এসব কেবল দৃশ্য নয়; একসময়ের উত্তাল ইতিহাসকে জীবন্ত করে তোলার শিল্পকৌশল। আর সেই শিল্পী ছিলেন জহির রায়হান—বাংলা চলচ্চিত্রের সাহসী কণ্ঠ, যিনি সিনেমাকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম ভাবেননি, ভেবেছিলেন প্রতিরোধের ভাষা হিসেবে।
Visit hilogame.news for more information.
অনুমতি না পাওয়া স্বপ্ন, তবু থামেননি
১৯৬৫ সালে জহির রায়হান একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তান সরকার সেই অনুমতি দেয়নি। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি তখনো শাসকদের কাছে অস্বস্তির, ভয়ের। ফলে স্বপ্নটি আটকে যায় কাগজে-কলমে। কিন্তু শিল্পী থেমে থাকেননি। তিনি বুঝেছিলেন, সরাসরি বলা না গেলে প্রতীকী ভাষায় বলতে হবে। তাই ১৯৭০ সালে নির্মিত ‘জীবন থেকে নেয়া’য় একুশের দৃশ্য সংযোজন করে তিনি তৈরি করেছিলেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। একটি সংসারের প্রতীকী গল্পের ভেতর দিয়ে তিনি তুলে ধরলেন শাসন-নিপীড়ন, প্রতিবাদ আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। ছবিতে রবীন্দ্রসংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ ব্যবহার করা ছিল এক সাহসী সিদ্ধান্ত, যে গানটি পরবর্তী সময় স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হবে। পাশাপাশি ছিল ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’, যা চলচ্চিত্রের আবেগকে সরাসরি যুক্ত করে দেয় ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগের সঙ্গে।
প্রভাতফেরির সেই রাত
১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারি। এফডিসিতে শুটিং চলছে। ১৯ ফেব্রুয়ারি রাত পর্যন্ত কাজের পর জহির রায়হান ইউনিটকে ডাকলেন। জানালেন, ২০ ফেব্রুয়ারি সকালের শিফটের পর রাত ১২টার পর সবাই যাবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে হবে ‘লাইভ’ শুটিং। প্রথমে অনেকেই বুঝতে পারেননি। পরে পরিষ্কার হলো—ছবির ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দৃশ্যটি কৃত্রিম সেটে নয়, বাস্তব শহীদ মিনারেই ধারণ করা হবে।
প্রয়াত চিত্রনায়ক রাজ্জাক পরে স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, গাড়ির হেডলাইটের আলোতেই হবে শুটিং। আলাদা লাইটিংয়ের ব্যবস্থা নেই। ক্যামেরাম্যান আগে থেকেই অবস্থান নেবেন। শিল্পীদের নির্দেশ দেওয়া হলো—না বলা পর্যন্ত গাড়ি থেকে বের হওয়া যাবে না। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহীদ মিনারের দিকে মানুষের ঢল নামতে শুরু করল।
নির্দিষ্ট সময়ে মিছিল এগিয়ে এলে শিল্পীরা জুতা খুলে মিছিলের অগ্রভাগে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন আনোয়ার হোসেন, সুচন্দা, রোজী আফসারী প্রমুখ।
মিছিলকারীরা প্রথমে বিস্মিত। তারপর অনুরোধ—ধাক্কাধাক্কি না করতে। কয়েকটি গাড়ির হেডলাইট জ্বলে উঠল। কোরাসে ভেসে উঠল—‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি…।’ শিল্পীরা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন শহীদ মিনারের বেদির দিকে। ফুল অর্পণ করলেন। মুহূর্তেই হুড়োহুড়ি, উত্তেজনা। টানাহেঁচড়ার মধ্যেও দৃশ্য ধারণ সম্পন্ন হলো।
এরপরও কাজ শেষ নয়। যেতে হলো সালাম-বরকতের কবরে। আকাশ তখন ফরসা হচ্ছে। নিদ্রাহীন ক্লান্ত শরীর, তবু শট চলছে। ভোরের আলোয় প্যাকআপ। রাজ্জাক পরে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন, ছবিতে দৃশ্যটি দেখে মনে হয়নি এত অনিশ্চয়তার মধ্যে শুটিং হয়েছিল।
প্রতীকী সংসার, বাস্তব রাজনীতি
ছবির কাহিনি আবর্তিত হয় বড় বোন রওশন জামিল, স্বামী খান আতাউর রহমান, দুই ভাই শওকত আকবর ও রাজ্জাক, দুই ভাইয়ের বউ রোজী ও সুচন্দা, বাড়ির গৃহপরিচারক এবং রোজী-সুচন্দার বড় ভাই রাজনীতিবিদ আনোয়ার হোসেনকে ঘিরে। পুরো বাড়িতে রওশন জামিলের একচ্ছত্র আধিপত্য। তাঁর প্রতাপশাসিত সংসারে চলে আসে দুই ভাইয়ের দুই স্ত্রী। এবার এই সংসারের চাবির গোছা নিজের মুঠোয় আনার কূটকৌশল চরমে পৌঁছায়। ছবিতে একাকার হয়ে যাচ্ছিল রওশন জামিল আর সময়ের পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের মুখচ্ছবি। আনোয়ার হোসেন সে সময়ের জনপ্রিয় ও সচেতন দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতা, রাজ্জাক প্রতিবাদী বিদ্রোহী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি। ছবির শেষে নবজাতকের আবির্ভাব ঘটে, তার নাম মুক্তি। শিল্পের ছত্রচ্ছায়ায় এ যেন পরাধীন বাংলার স্বাধীনতার ঘোষণা।
সুচন্দা স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, গল্পটি ছিল প্রতীকী। কিন্তু একুশের প্রসঙ্গ যুক্ত হওয়ার পর ছবিটি অন্য মাত্রা পায়। তিনি মনে করেন, জহির রায়হান জনতাকে বোঝাতে চেয়েছিলেন—পাকিস্তানি শাসকেরা স্বেচ্ছায় কিছু দেবে না; আন্দোলন করেই অধিকার আদায় করতে হবে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মতোই।
ছবিতে একুশের দৃশ্য আরোপিত মনে হয়নি; বরং তা যেন গল্পের স্বাভাবিক পরিণতি। দর্শকের মনে এটি বিস্ফোরকের মতো কাজ করেছিল। ১৯৭০ সালের উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই দৃশ্য ছিল প্রতিবাদের এক শিল্পিত ঘোষণা।
স্ক্রিপ্ট থেকে বাস্তবতায়
১৯৬৯-৭০ সালের দিকে অবাঙালি প্রযোজক আনিস দোসানি অনুজ পরিচালক জহির রায়হানকে একটি ছবি বানাতে বললেন। কাহিনি ও চিত্রনাট্যের জন্য ডাকা হলো অভিনেতা ও নির্মাতা আমজাদ হোসেনকে। জহির রায়হান তাঁকে বলেন, ‘এমন একটা গল্প হবে, যেখানে এক বোন আরেক বোনকে বিষ খাওয়াবে।’ আমজাদ বলেন, ‘বোন বোনকে বিষ খাওয়াবে! দর্শক কি ব্যাপারটা গ্রহণ করবে?’
সে সময়ের স্মৃতিচারণা করে এক সাক্ষাৎকারে চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব আমজাদ হোসেন জানিয়েছিলেন, স্ক্রিপ্টের কাজ শুরু হয়েছিল দুই বোনকে কেন্দ্র করে। ধীরে ধীরে আলোচনায় আসে প্রভাতফেরির প্রসঙ্গ। সিদ্ধান্ত: কৃত্রিম কিছু করা হবে না। শুটিং হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারেই। শুটিংয়ের জন্য আগে থেকে বড় ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তবে যাতে নির্বিঘ্নে কাজ করা যায়, সে জন্য সাহায্য নেওয়া হয়েছিল রাশেদ খান মেননসহ আরও অনেকের। ক্যামেরা নিয়ে আগেভাগে অবস্থান নেন নুরুল হক বাচ্চু। একটি ক্যামেরা নিজেই পরিচালনা করেন জহির রায়হান। আরেকটি ইউনিটের সঙ্গে। নির্দেশমতো শিল্পীরা মিছিলের সঙ্গে একাকার হয়ে যান। একের পর এক শট নেওয়া হয়। পরে আমজাদ হোসেনের মনে হয়েছিল, যত ফুটেজ ধারণ হয়েছিল, তার এক-চতুর্থাংশও হয়তো ব্যবহার করা হয়নি। তবু যা রাখা হয়েছে, তা-ই যথেষ্ট ইতিহাস হয়ে উঠেছে।
ক্যামেরাকে ‘রাইফেল’ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন যিনিগান, যা হয়ে উঠল রাজনৈতিক উচ্চারণ
‘আমার সোনার বাংলা’ ও ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’—এই দুই গান ছবিতে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে জহির রায়হান কেবল আবেগ সৃষ্টি করেননি; তিনি রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন। পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রসংগীতের ওপর ছিল নানা বিধিনিষেধ। সেই পটভূমিতে ‘আমার সোনার বাংলা’ ব্যবহার করা ছিল সাহসী সাংস্কৃতিক অবস্থান। আর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’, যা ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি বহন করে, তা ছবির ভেতর দিয়ে হয়ে উঠেছে গণ-আন্দোলনের সংগীত। প্রেক্ষাগৃহে দর্শকেরা এই গান শুনে আবেগে ভেসেছেন, আবার রাজনৈতিক সচেতনতাও অনুভব করেছেন।
সময়কে অতিক্রম
‘জীবন থেকে নেয়া’ মুক্তির সময়ই রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে। ১৯৭০-এর নির্বাচন, স্বায়ত্তশাসনের দাবি, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জনরোষ—সব মিলিয়ে এক আগ্নেয়গিরির মুখে দাঁড়িয়ে ছিল দেশ। সেই সময়ে এই চলচ্চিত্র ছিল যেন এক সাংস্কৃতিক ম্যানিফেস্টো। জহির রায়হান হয়তো ভাবেননি তাঁর এই কাজ এত দূর যাবে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—এই চলচ্চিত্র কেবল একটি শিল্পকর্ম নয়; এটি প্রতিরোধের দলিল।
বর্তমানে চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির উপদেষ্টা মিঞা আলাউদ্দিন তখন চলচ্চিত্র সাংবাদিক। সেই সময়ের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘ছবিটিকে সেন্সর ছাড়পত্র না দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল তৎকালীন প্রশাসন। কারণ, তারা বুঝতে পারে, রওশন জামিলের চরিত্রটি একটি স্বৈরাচারের চরিত্র। ছবির সংশ্লিষ্টরাও কম যান না। তাঁদের পরোক্ষ উদ্যোগে দর্শক মিছিল করেছিলেন। সামরিক সরকার বাধ্য হয় ছবিটি মুক্তি দিতে। কিন্তু মুক্তির প্রথম দিনই সারা দেশে হইচই পড়ে গেল।
‘আর প্রথম দিনেই নিষিদ্ধ হলো প্রদর্শনী। সব সিনেমা হল থেকে জব্দ করে নিয়ে গেল সিনেমার রিল। আমি ঢাকার গুলিস্তান হলে ছবিটি দেখতে গিয়েছিলাম। সেদিন প্রজেকশন রুম থেকে রিল নিয়ে গেলে শত শত দর্শক হলের সামনে এসে বিক্ষোভ করেন। সিদ্ধান্ত হলো, পরদিন সেন্সর বোর্ড আবার বসবে। আবারও সেন্সর বোর্ড অনুমোদন দিল বটে, তবে প্রজেকশন শেষে তৎকালীন জেনারেল রাও ফরমান আলী পরিচালকের উদ্দেশে বলেন, “ছবিটি ছেড়ে দিলাম, তবে আমি তোমাকে দেখে নেব।”’
চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যদি তিনি বেঁচে থাকতেন, হয়তো সরাসরি একুশ নিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করতেন। তবু ‘জীবন থেকে নেয়া’য় সংযোজিত একুশের দৃশ্য তাঁর অপূর্ণ স্বপ্নের পূরণ হিসেবেই থেকে গেছে।