যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বাণিজ্যচুক্তির তুলনা
· Prothom Alo

৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে অস্থায়ী একটি সরকারের কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখে এই চুক্তি স্বাক্ষরের ঘটনা নানা কারণে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে চুক্তিতে শুল্ক ছাড়াও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, বাজার উন্মোচন, জাতীয় নিরাপত্তাসহ কৌশলগত নানা শর্ত যুক্ত হওয়ায় এতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা রক্ষিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে দুই পর্বে লিখেছেন কল্লোল মোস্তফা। আজ প্রকাশিত হলো শেষ পর্ব।
Visit djcc.club for more information.
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বেশ কিছু দেশ বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করেছে। অভিযোগ উঠেছে যে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তিতে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, বাজার উন্মোচন, জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন ধারায় যে ধরনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, অন্য অনেক দেশের সঙ্গে চুক্তির শর্তগুলো ততটা কঠোর নয়।
বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য অন্যান্য দেশের চুক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তির তুলনামূলক পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এ থেকে বোঝা যাবে, কোন দেশ কেমন চুক্তি করেছে, দর–কষাকষির মাধ্যমে দেশের স্বার্থ কতটা রক্ষা করতে পেরেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) ওয়েবসাইটে এখন পর্যন্ত ৭টি দেশের চুক্তির কপি পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো হলো: মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, আর্জেন্টিনা, বাংলাদেশ ও তাইওয়ান।
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মালয়েশিয়ার চুক্তির কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ ধারার সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তির অনুরূপ ধারার তুলনামূলক আলোচনা করা হলো। এ থেকে বোঝা যাবে, চুক্তিতে কোন দেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি যেভাবে দেশের স্বার্থবিরোধীকরসুবিধা-বিষয়ক অভিযোগ
বাংলাদেশ: যুক্তরাষ্ট্র তার রপ্তানির ওপর কর ছাড় দিলে বা কর না নিলে বাংলাদেশ তার বিরুদ্ধে কোনো পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে না বা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) কোনো অভিযোগ করবে না (আর্টিকেল ২.১)।
মালয়েশিয়া: কোনো পক্ষই অন্য পক্ষের এ ধরনের করনীতির বিরুদ্ধে ডব্লিউটিওতে অভিযোগ করবে না (আর্টিকেল ২.১)।
মন্তব্য: মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে ডব্লিউটিওর কাছে অভিযোগ না জানানোর শর্তটি যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়া উভয় দেশের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি একতরফা। এ ছাড়া মালয়েশিয়ার চুক্তিতে পাল্টা পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার কোনো অঙ্গীকার নেই।
ডিজিটাল বাণিজ্যচুক্তি
বাংলাদেশ: বাংলাদেশ যদি অন্য দেশের সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্যচুক্তি করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাতিল করে আবার উচ্চশুল্ক আরোপ করতে পারবে (আর্টিকেল ৩.২)।
মালয়েশিয়া: মালয়েশিয়া অন্য দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি করার আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করবে (আর্টিকেল ৩.৩)।
মন্তব্য: বাংলাদেশ কার্যত যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি বাতিল করার ক্ষমতা দিয়েছে। মালয়েশিয়া শুধু আলোচনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ফলে মালয়েশিয়া নিজের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্যনীতির স্বাধীনতা বেশি ধরে রেখেছে।
ডিজিটাল কনটেন্টে শুল্ক
বাংলাদেশ: বাংলাদেশ ডিজিটাল কনটেন্টে কোনো শুল্ক আরোপ না করার অঙ্গীকার করেছে (আর্টিকেল ৩.৩)।
► মালয়েশিয়ার চুক্তির সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। ► যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে এই চুক্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের হাত–পা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
মালয়েশিয়া: উভয় দেশ ডিজিটাল কনটেন্টে কোনো শুল্ক আরোপ না করার অঙ্গীকার করেছে। তবে চুক্তিতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার গ্যাট চুক্তির নিয়ম মেনে অভ্যন্তরীণ কর বা ফি আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে (আর্টিকেল ৩.৫)।
মন্তব্য: মালয়েশিয়া ভবিষ্যতে ডিজিটাল কনটেন্ট থেকে রাজস্ব সংগ্রহের সুযোগ রেখে দিয়েছে। বাংলাদেশ সেই সুযোগ হাতছাড়া করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা অনুসরণ
বাংলাদেশ: যুক্তরাষ্ট্র যদি অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তার কারণে কোনো বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেয়, বাংলাদেশকে তার সঙ্গে মিল রেখে একই ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে (আর্টিকেল ৪.১-১)।
মালয়েশিয়া: যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে অথবা ব্যবস্থা গ্রহণের সময়সীমা ঠিক করবে। এ ব্যবস্থা দুই দেশের যৌথ অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে সদিচ্ছা ও পারস্পরিক অঙ্গীকারের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে (আর্টিকেল ৫.১-১)।
মন্তব্য: বাংলাদেশ বাধ্যতামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করার অঙ্গীকার করলেও মালয়েশিয়া এ রকম একতরফা কোনো অঙ্গীকার করেনি। আলোচনার সুযোগ রেখেছে এবং নিষেধাজ্ঞা অনুসরণের ক্ষেত্রে দুই দেশের যৌথ অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলার শর্ত দিয়েছে।
বিদ্যমান অধিকারের স্বীকৃতি
বাংলাদেশ: বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বিদ্যমান অধিকারগুলোর কোনো স্বীকৃতি চুক্তিতে নেই।
মালয়েশিয়া: যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়া উভয়ই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অধীনে থাকা তাদের অধিকার ও দায়িত্বগুলো মেনে চলবে। এর মধ্যে রয়েছে একটি দেশের সেই বিশেষ ক্ষমতা বা অধিকার, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারে, অন্যায্য ব্যবসা বা বাণিজ্য বন্ধ করতে পারে এবং জনগণের স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে (আর্টিকেল ৭.১)।
মন্তব্য: বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে অধিকারগুলোর স্বীকৃতি আদায়ের মাধ্যমে মালয়েশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের অন্যায্য শর্ত মোকাবিলার পথ খোলা রেখেছে।
তৃতীয় দেশের কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ
বাংলাদেশ: তৃতীয় কোনো দেশের কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কম দামে পণ্য রপ্তানি করলে তা ঠেকানোর ব্যবস্থা নিতে হবে বাংলাদেশকে (আর্টিকেল ৪.১-২)।
মালয়েশিয়া: তৃতীয় কোনো দেশের কোম্পানি মালয়েশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কম দামে পণ্য রপ্তানি করলে মালয়েশিয়া নিজস্ব আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে (আর্টিকেল ৫.১-২)।
মন্তব্য: বাংলাদেশ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব মেনে নিলেও মালয়েশিয়া নিজস্ব আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
বিনিয়োগ সুবিধা
বাংলাদেশ: জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও রপ্তানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের সহযোগিতা করতে হবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন ও অবকাঠামো খাতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সমান সুযোগ–সুবিধা প্রদান করতে হবে (আর্টিকেল ৫.১)। তেল-গ্যাস, বিমা ও টেলিযোগাযোগ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজি বিনিয়োগে কোনো সীমা আরোপ করা যাবে না (আর্টিকেল ১.১৬, অ্যানেক্স ৩)।
মালয়েশিয়া: মালয়েশিয়া নিজস্ব আইন অনুযায়ী খনিজ, জ্বালানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন ও অবকাঠামো খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ সহজ করবে (আর্টিকেল ৬.১)। মালয়েশিয়া যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানি নিষিদ্ধ করা থেকে বিরত থাকবে (আর্টিকেল ৬.২, অ্যানেক্স ৩)।
মন্তব্য: মালয়েশিয়া নিজ দেশের আইন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাংলাদেশের মতো নিজ দেশের কোম্পানির মতো সমান সুযোগ দেওয়ার অঙ্গীকার করেনি, তেল-গ্যাস-বিমা-টেলিযোগাযোগের মতো কৌশলগত খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগসীমা তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়নি এবং তেল-গ্যাসের মতো জ্বালানি রপ্তানি অনুমোদনের অঙ্গীকার করেনি।
ভর্তুকিসংক্রান্ত তথ্য
বাংলাদেশ: যুক্তরাষ্ট্রের লিখিত অনুরোধে বাংলাদেশকে দেশের ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে দেওয়া সব ধরনের ভর্তুকির তথ্য দিতে হবে এবং বাজারের প্রতিযোগিতায় ভর্তুকির ক্ষতিকর প্রভাব প্রশমনের উদ্যোগ নিতে হবে (আর্টিকেল ৫.২)। চুক্তি কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে ডব্লিউটিওর কাছে সব ধরনের ভর্তুকির পূর্ণ বিবরণ জমা দিতে হবে। (সেকশন ৬, অ্যানেক্স ৩)
মালয়েশিয়া: মালয়েশিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে ‘গোপনীয় নয়’, এমন ভর্তুকির তথ্য প্রদান করবে এবং বাজারের প্রতিযোগিতায় ক্ষতিকর প্রভাব প্রশমনের উদ্যোগ নেবে (আর্টিকেল ৬.২)।
মন্তব্য: মালয়েশিয়া শুধু গোপনীয় নয়, এমন ভর্তুকির তথ্য যুক্তরাষ্ট্রকে প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এবং ডব্লিউটিওকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভর্তুকির তথ্য দেওয়ার কোনো অঙ্গীকার না করে দেশীয় শিল্পের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেছে।
কৃষিপ্রযুক্তিপণ্য
বাংলাদেশ: চুক্তি স্বাক্ষরের ২৪ মাসের মধ্যে এমন নীতিমালা তৈরি করতে হবে যেন যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপদ বলে স্বীকৃত বায়োটেকনোলজি বা জৈবপ্রযুক্তিপণ্য বিনা পরীক্ষা ও বাড়তি কোনো লেবেলিং ছাড়াই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে (আর্টিকেল ১.৬, অ্যানেক্স ৩)।
মালয়েশিয়া: দেশের আইন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের জৈব প্রযুক্তিপণ্য মালয়েশিয়ার বাজারে প্রবেশে সহযোগিতা করবে (আর্টিকেল ২.১১, অ্যানেক্স ৩)।
মন্তব্য: বাংলাদেশ জেনেটিক্যালি মডিফাইড কৃষি ও খাদ্যপণ্য আমদানির নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে; এমনকি লেবেল দিয়ে চিহ্নিত করতে বাধ্য করতে পারবে না যে সেটা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। মালয়েশিয়া দেশের আইন অনুযায়ী সহযোগিতার কথা বলে এই বাধ্যবাধকতা পাশ কাটিয়েছে।
সার্বিক বিশ্লেষণ
ওপরের আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া বেশ কৌশলী অবস্থান নিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কমানোর জন্য বাধ্য হয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করলেও চুক্তির সব শর্ত বাংলাদেশের মতো একতরফাভাবে মেনে নেয়নি; দক্ষতার সঙ্গে দর–কষাকষির মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে চুক্তির শর্তগুলো উভয় পক্ষের জন্য প্রযোজ্য রেখেছে। চুক্তিতে দেশীয় কিংবা আন্তর্জাতিক আইন মানার শর্ত যুক্ত করেছে। অনেক ক্ষেত্রে আলোচনার সুযোগ রেখেছে।
অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতাগুলো স্রেফ একতরফা, নিজস্ব আইন বা আন্তর্জাতিক চুক্তির রক্ষাকবচ অনুপস্থিত। মালয়েশিয়ার চুক্তিতে নেই, এ রকম ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক ধারাও বাংলাদেশের চুক্তিতে রয়েছে। যেমন: বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটা বাড়াতে হবে এবং অন্য দেশ থেকে কেনা কমাতে হবে (সেকশন ৬, অ্যানেক্স ৩); যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সমান সুযোগ–সুবিধা প্রদান করতে হবে (আর্টিকেল ৫.১) এবং চুক্তি কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় সব ধরনের ভর্তুকির তথ্য জমা দিতে হবে (সেকশন ৬, অ্যানেক্স ৩)।
বাংলাদেশের করণীয়
মালয়েশিয়ার চুক্তির সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। দর–কষাকষির মাধ্যমে দেশের স্বার্থ যতটুকু রক্ষা করা যেত, অন্তর্বর্তী সরকার তা করেনি বা করতে পারেনি। আসলে এ ধরনের একটা চুক্তিতে দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য যে ধরনের অঙ্গীকার থাকা প্রয়োজন, তা একটি অস্থায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের থাকে না। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটি তাই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে এই চুক্তিতে যেভাবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের হাত–পা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তা নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক বিষয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথে বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।
নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে চুক্তিটি এখনো কার্যকর হয়নি। নিয়ম হলো, উভয় দেশে অভ্যন্তরীণ আইনগত অনুমোদন সম্পন্ন হওয়ার পর এবং আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিফিকেশন বিনিময়ের ৬০ দিন পর চুক্তিটি কার্যকর হবে (আর্টিকেল ৬.৬); কাজেই বিএনপি সরকারের উচিত, জাতীয় স্বার্থে এই সুযোগ কাজে লাগানো এবং চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার আগেই পার্লামেন্টারি রিভিউ কমিটির মাধ্যমে চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন ও সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া।
● কল্লোল মোস্তফা লেখক ও গবেষক
*মতামত লেখকের নিজস্ব