শিশুদের স্কুলভীতি ও অভিভাবকের করণীয়

· Prothom Alo

প্রথম আলো ট্রাস্টের একটি আয়োজন বিনা মূল্যে মাদকবিরোধী পরামর্শ সহায়তা সভা। এ আয়োজনের আওতায় গত ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ প্রথম আলোর কার্যালয় কারওয়ান বাজারে ১৭৪তম পরামর্শ সহায়তা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত থেকে ডা. রাহেনুল ইসলাম, মনোবিদ, কেন্দ্রীয় মাদক শক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র পরামর্শ প্রদান করেন। এইবারের বিষয়টি ছিল —' শিশুদের স্কুলভীতি ও অভিভাবকের করণীয়। অনুষ্ঠানটি সাক্ষাৎকার আকারে তুলে ধরা হলো।

আমরা যখন আমাদের বাচ্চাদেরকে স্কুলে ভর্তি করি, তখন অধিকাংশ বাচ্চাদের দেখা যায় যে তারা স্কুলে যেতে চায় না। অভিভাবকদের স্কুলের গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, বা কিছুক্ষণ পর পর উঁকি দিয়ে দেখতে হয় যে বাবা বা মা দাঁড়িয়ে আছেন কিনা। শিশুদের মধ্যে এই ভীতিটা তৈরি হওয়ার কারণ কী?

Visit asg-reflektory.pl for more information.

ডা.রাহেনুল ইসলাম: প্রথমেই সবার আগে বোঝা দরকার যে আসলে শিশুদের মনস্তত্ত্বটা কাজ করে কিভাবে। আমরা বড় হয়ে যাওয়ার কারণে আসলে ভুলে গিয়েছি যে ছোটবেলায় আমরা কিভাবে ভাবতাম। একজন শিশুর পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে, পৃথিবীর সাথে তার দেখাশোনা শুরু হয় কাছের মানুষকে দিয়ে। যাদের সাথে সে সংযুক্ত হয় বা 'অ্যাটাচড' হয়। এই সংযুক্তিটা হলো একটি আবেগীয় বন্ধন যেখান থেকে সে ইতিবাচকভাবে পরিচালিত হয়—তার কষ্টগুলোকে তার কেয়ারগিভাররা সামলান, তাকে প্রশংসা করেন, নিরাপত্তা দেন, তার ক্ষুধা মেটান ইত্যাদি।

এই মানুষগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ব্যাপারটা কিন্তু তার জন্য অনেক ভয়ের ব্যাপার। জীবনের প্রথম স্কুলের দিনটাতে শিশুটা ভয় পাবে, একটু আঁকড়ে ধরবে—এটা কিন্তু আমরা বলবো স্বাভাবিক আচরণ। বরং উল্টোটা যদি ঘটে যে শিশুটি একেবারেই ভয় পাচ্ছে না, কাছের মানুষকে মিস করছে না, তাহলে বলবো বরং এটাই বরং ভয়ের ব্যাপার। তার মানে হলো সে বিপদ-আপদ বুঝতে পারছে না।

খানে একটি জটিল ব্যাপার হলো, সন্তানের সাথে বাবা-মা হোক বা দাদা-দাদী—আমাদের প্রাইমারি কেয়ারগিভারের সম্পর্কটা যত ক্রিটিক্যাল, তত সমস্যা। খুব সহজভাবে আমি বলতে চাই—শিশুর সাথে আপনার বন্ধনটা স্বাভাবিক আছে কি নেই, এটা বোঝার সবথেকে ভালো বুদ্ধি হলো যখন আপনাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা হলো, ধরা যাক আপনাকে ছেড়ে সে বাড়ির বাইরে কোথাও গেল, সেখান থেকে ফিরে আসার পর যখন পুনর্মিলন হচ্ছে, সেই সময়কার আচরণটা বলে দেয় বন্ধনটা সুস্থ না অসুস্থ।

যদি এমন হয় যে শিশুটি বাইরে থেকে আসার পর কোল থেকে নামতেই চাচ্ছে না, একেবারে আঁকড়ে ধরে আছে, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যা আছে। আবার যদি এমন হয় যে শিশুটি বাড়ি থেকে আসার পর একেবারে এড়িয়ে গিয়ে মুখ ফিরিয়ে চলে গেল, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যা আছে।

সমস্যা নেই কখন বলবো? যখন দেখবো বাইরে থেকে ফিরে আসার পর, যার সাথে শিশুটি আবেগীয়ভাবে সংলগ্ন আছে, তার কোলে উঠলো, আদরের মতন ভাবে একটু ভাব বিনিময় করলো, তারপর সে যে কাজটা করছিল সে কাজে আবার ফিরে চলে গেল। তাহলে বুঝতে হবে তার বন্ধনটা স্বাভাবিক আছে।

আরেকটি বিষয় হলো—দুই বছর, তিন বছর, চার বছর, পাঁচ বছর—প্রত্যেকটি বয়সের গল্প কিন্তু একটি একটি করে আলাদা। চার বছর বয়সের ক্ষেত্রে আপনি যদি শিশুদেরকে মাঠে নিয়ে যান, খেয়াল করে দেখবেন শিশুরা কিন্তু একটা দৌড় দেয়। দৌড় দেওয়ার পর কিন্তু একটা অদৃশ্য একটা সুতার একটা মাপ আছে, যেখানে নির্দিষ্ট জায়গায় একটা শক্ত ব্রেক আসে, তারপর কিন্তু ঘুরে দেখে যে আপনি আছেন কিনা। এই যে দূরত্বটা—এটা কিন্তু বলা যেতে পারে তার একটা নির্দ্বিধামূলক দূরত্ব। এই দূরত্ব পর্যন্ত যেতে সে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, এর বাইরের পৃথিবীটাকে তারপর সে কিন্তু অন্বেষণ করে। এই দূরত্বটা যত আস্তে আস্তে বাড়বে, ততই আমরা বলবো স্বাভাবিক বিকাশ হচ্ছে। এই দূরত্বটা যদি খুব কম হয়, দেখা গেল আপনি ছেড়ে দিলেন, শিশু আপনার কাছ থেকে একেবারেই নড়ছে না, ১০ ফুটও দূরে যাচ্ছে না—তাহলে বুঝতে হবে তার অ্যাটাচমেন্টে সমস্যা আছে।

প্রাথমিক পর্যায়ে যে একটু বারবার করে এসে দেখে যাওয়াটা—দুই দিন, তিন দিন, চার দিন—এটি কিন্তু একটা স্বাভাবিক প্রকাশ। এটিকে আমরা রোগ বলবো না। তবে যদি একটানা ছয় মাস মাকে একদম ক্লাসের বাইরে বসে থাকতে হয়, তাহলে বুঝতে হবে যে মা এবং সন্তান দুজনের মনে কোনো একটা সমস্যা আছে।

তার মানে, বিষয়টা আসলে শুধুমাত্র ' স্কুলে যেতে ভয় পায় ' তা নয়। এটি একটি দীর্ঘ সময় ধরে পরিবারের সঙ্গে থাকা এবং শুরুর দিকের অ্যাটাচমেন্টের সঙ্গে যুক্ত। যদি টানা ছয় মাস এরকম হয়, তাহলে এটি একটি সিম্পটম যে আপনাদের দ্বারস্থ হতে হবে।

ডা. রাহেনুল ইসলাম: একদমই তাই। স্কুলভীতির জন্য বাংলা ইংরেজিতে যে শব্দটা ব্যবহৃত হয়—স্কুল রিফিউজাল—এটাকে কোনো রকম রোগ বা ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। কিন্তু এটি এমন একটি গুরুতর পরিস্থিতি, যেখানে আমাদের মেন্টাল হেলথ ইন্টারভেনশন দরকার। এর অর্থ কিন্তু এটা না যে ওষুধ দরকার। অনেক সময় শুধু পরামর্শই যথেষ্ট। এই ধরনের ঘটনা ঘটলে আমাদের গভীরে কী আছে, সেটা খুব ভালোভাবে খুঁজে দেখার দরকার আছে। কারণ একজন শিশুর পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে, স্কুলিংটা কিন্তু বাধ্যতামূলক। উন্নত দেশগুলোতে একটি শিশু যদি বড় কোনো অপারেশনের মধ্য দিয়েও যায়, স্কুল থেকে শিক্ষক কিন্তু তাকে দেখে আসেন। স্কুল একজন শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য এমন একটা প্রতিষ্ঠান যার কোনো বিকল্প নেই।

আমি সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া একটি বিষয়ে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। যেখানে একটি স্কুলে শিশুকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে এবং শিশুটি আতঙ্কগ্রস্ত হয়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে অভিভাবক হিসেবে করণীয় কী? যখন বাচ্চা স্কুলে যাচ্ছে, স্কুলের পরিবেশটা স্বাভাবিক কিনা, বাচ্চার জন্য নিরাপদ কিনা, এই বিষয়গুলো নিয়ে অভিভাবক হিসেবে আমাদের করণীয় কী? এবং বাচ্চাকে এই ভয়-ভীতিগুলো থেকে দূরে রাখবার জন্য করণীয় কী?

ডা. রাহেনুল ইসলাম: সহজভাবে এভাবে বলা যায়: একজন শিশুর দৃষ্টিকোণ থেকে সবার আগে আসেন তার বাবা-মা। তাদের পৃথিবীর সাথে তার প্রাথমিক সম্পর্কটা এই দুজনের মাধ্যমে হচ্ছে। এর পাশাপাশি কিন্তু স্কুল আরেকটি সিস্টেম, যেখানে টিচাররা আছেন, দারোয়ানেরা আছেন, সাপোর্টিং স্টাফরা আছেন। এই স্কুলটি আরেকটি জগৎ বা সিস্টেম যেখানে শিশুটি বিভিন্ন রকমভাবে ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া করে। আর এর বাইরে আছে আমাদের প্রতিবেশী—সব মিলিয়ে সবার পারস্পরিক ক্রিয়ার মাধ্যমে কিন্তু একজন শিশুর সুস্থ মনোজগত গড়ে ওঠে।

বিশেষত শহুরে জীবনের প্রেক্ষাপটে, যেখানে বিশেষ করে বাবা-মা দুজনেই চাকরিতে যুক্ত আছেন, সেক্ষেত্রে কেয়ারগিভার হিসেবে যিনি আছেন, তিনি অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষিত বা প্রশিক্ষিত নন এবং যার সাংস্কৃতিক ও নৈতিক মানটা অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ। এটা একটা সমস্যা। আর আমাদের স্কুলগুলোর ক্ষেত্রে কিন্তু একটা ভয়াবহ রকম বৈষম্য আছে। সব স্কুলের শিক্ষকের বেতন ও সম্মানী সমান নয়, অনেকে প্রশিক্ষিত নন যথাযথভাবে। কিভাবে শিশুর বিকাশটাকে অ্যাডভাইস করতে হবে, কোন বয়সের আচরণটা স্বাভাবিক এগুলো তারা জানেন না।

বাবা-মার পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে প্রথমত দরকার হলো শিশুর সাথে তার একটা নিরাপদ যোগাযোগের বন্ধন তৈরি করা। একজন বাবা-মা কিন্তু শিশুর বন্ধু নন। আমরা কিন্তু অনেকেই এই ভুল কথাটা বলতে শুনি—'আমি তো আমার ছেলের বা আমার মেয়ের বেস্ট ফ্রেন্ড।' এ কথাটা শুনলে আমরা মনে মনে আঁতকে উঠি। কারণ তারা তাদের সমবয়সীদের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি করতে ব্যর্থ হয়ে গেছেন। বাবা এবং মা এটি এমন একটি পথ যেখানে আদর থাকবে, স্নেহ থাকবে, এর পাশাপাশি কিন্তু শাসন থাকবে। তাদেরকে কিছু কিছু বিষয় গাইড এবং নির্দেশনা দেওয়ার প্রয়োজন আছে ; এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রয়োজন আছে। তাদের রোল মডেলের দরকার আছে।

তাহলে প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে শিশুর সাথে একটা নিরাপদ আবেগের সম্পর্ক। এটি কীভাবে তৈরি করা যায়?

ডা. রাহেনুল ইসলাম: ধরুন, আমরা বড়রা কোনো একটা বড় ধরনের ভুল করেছি, ঠকেছি বা বোকা সেজেছি। এই গল্প আমি কাকে বলবো? যে জিজ্ঞাসা করা মাত্র একগাদা উপদেশ ধরিয়ে দেবে, 'হ্যাঁ, তোমার তো এইটাই হওয়ার কথা!'—তাকে নিশ্চয় আমি দুঃখের কথা বলবো না। আমি তাকে বলবো, যিনি সম্মানের সঙ্গে আমার কষ্টের কথাটা শেষ করতে না দিয়ে শুনবেন, যিনি আমার দুঃখটাকে সমমর্মী হয়ে স্পর্শ করার চেষ্টা করবেন। ঠিক এরকম সম্পর্কটা দরকার হচ্ছে শিশুদের সাথে।

সে যেন তার বিপদের কথা, তার কষ্টের কথাটা বলতে সাহস পায় এবং স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। সে যেন এটা না মনে করে যে—আমি বললাম মানে আমার ঘাড়ে বিপদ টেনে আনলাম। দরকার তার সাথে একটা স্পেস তৈরি করা, তার সাথে সম্মান দিয়ে কথা বলার একটা পরিসর তৈরি করা। এর পাশাপাশি একটা খুব জরুরী বিষয় সেটা হচ্ছে নিজের রোল মডেল হওয়া। আপনি আপনার আশপাশের সাথে কিভাবে মিশছেন, কিভাবে প্রতিক্রিয়া করছেন বা কিভাবে আপনি আপদ-বিপদ সামলাচ্ছেন। আপনি যদি ছোটখাটো বিপদেও ভেঙে পড়ে হাউমাউ করতে থাকেন, একে অন্যকে দোষারোপ করতে থাকেন ; আপনি শিশুকে যত ভালো প্রশিক্ষণ দেন না কেন, শিশুটি কিন্তু আপনার ওই আচরণটার প্রতিলিপি তৈরি করবে। যদি এই দুটো শর্ত পূরণ করেন, তাহলে দেখা যাবে যে শিশুটি চাপ সামলাতে সক্ষম হচ্ছে এবং স্কুলে যদি সে কোনো একটা ব্যবধানের মুখোমুখি হয়, সেটা আপনাকে সে নির্ভয়ে জানাচ্ছে।

শিশুদের একটা সার্ভেলেন্স রাখার দরকার আছে। শিশুর শরীরে কোনোরকম অবাঞ্ছিত কোনো দাগ আছে কিনা, তার কাপড়ে কোনো দাগ আছে কিনা, তার শরীরের কোথাও কোনো রকম ট্রমা আছে কিনা—এগুলো অভিভাবক হিসেবে জানাটা আপনার আমার জন্য অবশ্যই করণীয় কর্তব্য। এখানে কিন্তু এমন কোনো অপশন নেই যে আমি ব্যস্ত ছিলাম, সময় পাইনি, তাই পারিনি। এটা আমাদের প্রাকৃতিক এবং আইনগত রেসপন্সিবিলিটি। শিশুটি আঘাত পেয়েছে, আমি এক্সামিনেশন করি নাই, এজন্য আমি বুঝি নাই। এই কথার মাধ্যমে কিন্তু আমরা দায়মুক্তি পাইনা। আমাদের অবশ্যই একটা পরিষ্কার মনোযোগ রাখতে হবে শিশুর খাওয়া, ঘুম, বা মেজাজের পরিবর্তন হচ্ছে কিনা।

স্কুলে ভীতিকর কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হলো সেই মুহূর্তে ওই ট্রমাটা কাটিয়ে নেওয়ার জন্য অভিভাবকের কি করা উচিত? স্কুলিং তো ভেরি ইম্পর্টেন্ট, সমাধানটা কি হবে? বাচ্চাকে আরেকটু সাহসী করে কিভাবে সামনের জন্য তৈরি করবেন?

ডা. রাহেনুল ইসলাম: সমাধানটা এক কথায় নেই, কারণ একেকটা ঘটনা একেক রকম। তবে তার আগে আমি একটা বিষয় যোগ করতে চাই—কীভাবে বুঝবো যে আমাদের সমস্যা হচ্ছে? বাচ্চারা যখন স্কুলে যেতে চায় না বা অপছন্দ করে, তার কিন্তু একটা খুব কমন প্রকাশ থাকে পেট ব্যথা। অনেক ক্ষেত্রে আমরা ভাবি যে শিশুটি বোধহয় অভিনয় করছে, স্কুল এড়িয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু পেট ব্যথা কিন্তু তার অভিনয় নয়।

আমাদের উদ্দেশ্য যেকোনো প্রকারে শিশুটাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া। এবং এটা মাথায় রাখতে হবে স্কুল কিন্তু কোচিং সেন্টারের কোনো বিকল্প নয়। স্কুলে আমরা শুধুমাত্র দুটো তথ্যের পাশাপাশি আদব-কায়দা, নেতৃত্ব, দলের সদস্য হিসেবে ভূমিকা এই ধরনের মৌলিক মানবিক গুণাবলী শেখার সুযোগ পাই। স্কুলে বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে যে স্কুলটা মানহীন। যেখানে প্রশিক্ষিত শিক্ষক নেই, কাঠামোগত ঘাটতি আছে, নজরদারির ঘাটতি আছে। আপনার দায়িত্ব এমন স্কুলকে বেছে নেওয়া যেখানে প্রশিক্ষিত শিক্ষক আছেন। যদি কোনো কারণে শিশুটি সেখানে অপব্যবহারের (Maltreatment) শিকার হয়, এর দায় কিন্তু স্কুলের পাশাপাশি অভিভাবক হিসেবে আপনি এড়াতে পারবেন না।

যখন কোনো ঘটনা ঘটে, প্রথমত হচ্ছে এটাকে আমরা বালিশ চাপা যেন না দেই। আমরা ঘরের নিরাপদ পরিবেশে তার সাথে কথা বলব। সাইকোলজিস্ট-সাইকিয়াট্রিস্ট পরে আসবে। আর যদি এটা বাচ্চাদের কোনো বুলিংয়ের বিষয় থাকে, তবে সবার আগে কিন্তু আমাদের একটা বিষয় মাথায় রাখা দরকার যে বাচ্চাটা বুলিড হচ্ছে আর যে বাচ্চাটা বুলি করছে দুই বাচ্চারই মানসিক সমস্যা আছে। তাদের আচরণ প্রকাশের ধরনে ভিন্নতা আছে। এরকম ক্ষেত্রে কখনোই কিন্তু ওই শিশুটির অভিভাবকের কাছে অভিযোগ দেওয়া বা স্কুলে অভিযোগ দেওয়াটা কোনো ধরনের ফলপ্রসূ সমাধান না। সমাধান হচ্ছে সাইকোলজিস্ট এবং সাইকোথেরেপিস্টের সমন্বয়ে একটি টিম গঠন করে যৌথভাবে পরিবার মিলে শিশুটাকে প্রশিক্ষিত করে তোলা। তার মধ্যে ওই সেলফ সিস্টেমটাকে ডেভেলপ করা, যেন সে চাপটা মোকাবেলা করতে পারে। সে যেন বন্ধুত্ব তৈরি করতে পারে। কেউ যদি তাকে অপমান করে, সেটাকে যেন সে সম্মান বজায় রেখে প্রতিবাদ করতে পারে এটা তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব।

শিশুদের ক্ষেত্রে ওষুধের ব্যাপারে আমরা খুবই স্পর্শকাতর। আমরা খুবই বাধ্য না হলে ওষুধ সহজে দিতে চাই না। এটা আসলে সিদ্ধান্ত নেবেন বিশেষজ্ঞরা। এক কথায় হলো, প্রথম হলো শিশুর সাথে দরকার যোগাযোগের ব্যবস্থাপনা, তার সাথে কথা বলার মতো একটা পরিসর দরকার আছে। তার অবস্থাটার তীব্রতা নির্ণয় করা এবং অতি অবশ্যই বিশেষজ্ঞের মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা। গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো যদি আমরা উদ্যোগটা নিতে ব্যর্থ হই, এর দাম কিন্তু আজীবন দিতে হবে। শৈশবের একটা বুলিং, শৈশবের একটা অ্যাবিউজ সেটা ইমোশনাল হোক, ফিজিক্যাল হোক, সেক্সুয়াল হোক ; এই অ্যাবিউজের দাগ আমৃত্যু থাকে। পরিণত বয়সে দেখা যায় তার অন্য আরো শত রকম মানসিক রোগের প্রকোপের সম্ভাবনা দ্বিগুণ, তিনগুণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০০ গুণ বাড়ে। যেটা আমরা শৈশবে সমাধান করে ফেলতে পারতাম। আমাদের এই ধরনের সমস্যাগুলো যদি ঘটে, এটা কিন্তু একটা সুযোগ—যদি আমরা এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রয়োগ করে সমাধান করে ফেলতে পারি, তাহলে বলতে পারবো যে আমরা একটা যথাসময়ে অনেকগুলো মানসিক রোগের টিকা দিয়ে ফেলেছি, একটা ভ্যাকসিনেশন দিয়ে ফেলেছি, যেটা তাকে ভবিষ্যতে অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সমস্যা থেকে রক্ষা করবে।

এই আলোচনাগুলো নতুন এবং বর্তমান অভিভাবকদের জন্য ভীষণ রকমের কার্যকর হবে। আমাদের জীবনযাপনটা এমন যে মানসিক নানা রকম চাপ আমাদের জীবনে সারা জীবন ধরেই নানা ধাপে আসতে থাকে। তাই এগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা, বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়াটা কখন দরকার এগুলো অভিভাবকদের সব সময় জানা থাকা উচিত।

ডা. রাহেনুল ইসলাম: উচিত বলে বলবো কি? আমরা থাকতে বাধ্য। উচিত শব্দটা বললে কিন্তু একটা স্পেস থাকে যে বোধহয় না থাকলে হবে। আমি এটা ব্যবহার করতে চাচ্ছি আমাদের এটা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। এখান থেকে আমাদের পালানোর সুযোগ নেই। এই শিশুরা একদিন আমাদের চিকিৎসা করবে, ডাক্তার হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে, নতুন কিছু আবিষ্কার করবে। অতএব, আমাদের এটা উচিতের বদলে আমরা এটাকে অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসেবে ধরি। সময় আমাদের কাঁধে দায়িত্বটা চাপিয়ে দিয়েছে, আমাদের এটি এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, আপনি ব্যস্ত সমযয়ের মধ্যেও আমাদেরকে সময় দিয়ে এবং আমাদের সঙ্গে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। নিশ্চয়ই আপনার সঙ্গে অন্য কোন আয়োজনে আবারও দেখা হবে। আপনি ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। আবারও আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

ডা. রাহেনুল ইসলাম: আপনাকে এবং প্রথম আলোকে অনেক ধন্যবাদ।

Read full story at source