বাংলা ভাষার পথচলা ও বইমেলার ইতিহাস

· Prothom Alo

তবে একটি প্রশ্ন এখনো আলোচনায় আছে। আর সেটা হলো কোন প্রাকৃত ভাষা থেকে বাংলা এসেছে? ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মনে করেন...

প্রায় ছয় হাজার বছর আগের কথা। তখন পূর্ব ইউরোপ থেকে মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে গড়ে উঠেছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভাষা পরিবার। সে ভাষার নাম ছিল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা।

বিশ্বের অধিকাংশ ভাষা এসেছে এখান থেকে। সংস্কৃত, বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, ফরাসি, জার্মান, রুশ, গ্রিক, লাতিনসহ এ ভাষা থেকে জন্ম হয়েছে আরও কত ভাষা। ভাষা মানে শুধু শব্দ নয়। ভাষা মানে চিন্তা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, অনুভূতি। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার অনেক শাখা ছিল। সময়ের স্রোতে কিছু হারিয়ে গেছে। আবার কিছু আজও বেঁচে আছে। ইটালিক, জার্মান, গ্রিক, আলবেনীয়, ইন্দো-ইরানিয়ানসহ এগুলোই সেই শাখা।

Visit een-wit.pl for more information.

এই শাখাগুলোর মধ্যে ইন্দো-ইরানিয়ান ভাষাগোষ্ঠী ছিল একটি প্রধান শাখা। খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় দুই হাজার বছরের দিকে এই শাখার বিভাজন ঘটে। এখান থেকে ইন্দো-আর্য শাখা নামে আরেকটি শাখার জন্ম নেয়। এরপর আবার ইন্দো আর্য শাখার শুরু হয় আরেক যাত্রা। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ১২০০ শতকের দিকে তারা আফগানিস্তান হয়ে হিন্দুকুশ পর্বত পেরিয়ে ভারতের উত্তর-পশ্চিম দিয়ে পাঞ্জাবে প্রবেশ করে। এখানে তারা বসতি গড়ে। এরা ‘আর্য’ নামে নিজেদের পরিচয় দিত। আর্য মানে অভিজাত, সম্মানিত। তারা নিজেদের এক বিশেষ শ্রেণির মনে করত। আর্যরা ভারতে আসার আগে ভারতের যে প্রাকৃতজন বা সাধারণ মানুষ বাস করত, তারা হয়ে গেল অনার্য।

আর্যদের ছিল দেব–দেবীর ওপর বিশ্বাস। ছিল জীবনযাপনের নিয়ম। দেব–দেবীর উপাসনা ও জীবনযাপনের নিয়ম সংরক্ষণের জন্য তারা চারটি গ্রন্থ রচনা করে। এসব গ্রন্থের নাম হলো বেদ। চারটি বেদের মধ্যে রয়েছে—ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, অথর্ববেদ। এই বেদের মাধ্যমে প্রাচীন ভারতে শুরু হয় বৈদিক সংস্কৃতি। ধর্ম, সাহিত্য, দর্শনসহ সবকিছুর এক নতুন অধ্যায়। কিন্তু বেদের ভাষা ছিল কঠিন, খুবই নিয়মবদ্ধ। ব্যাকরণ কঠোর। উচ্চারণ জটিল। ভারতের প্রাকৃতজনের পক্ষে এই ভাষার ব্যবহার সহজ ছিল না। মানুষের মুখের ভাষা হতে হয় সহজ, সরল, সাবলীল। সাধারণ মানুষ আর্য ভাষা তাদের নিজেদের মতো করে উচ্চারণ করত। ফলে ভাষার বিকৃতি হতো।

এই সময় আবির্ভূত হন পাণিনি নামে এক মহান পণ্ডিত। তিনি বৈদিক সংস্কৃতের সমস্যা বুঝতে পারেন। তখন তাঁর মনে হলো, যদি একে সংস্কার করা যায়, তাহলে ভাষা আরও সুসংগঠিত হবে। তাই তিনি ‘অষ্টাধ্যায়ী’ নামে এক অসাধারণ ব্যাকরণ গ্রন্থ রচনা করেন। আট অধ্যায়ের এই গ্রন্থ ছিল ভাষাবিজ্ঞানের এক বিস্ময়। অনেকে বলেন, এটি পৃথিবীর প্রথম সৃজনশীল ব্যাকরণগ্রন্থের একটি।

পাণিনির হাত ধরে সংস্কৃত ভাষা নতুন রূপ পায়। এর নাম হলো দ্রুপদি সংস্কৃত বা বিশুদ্ধ সংস্কৃত।

প্রতীকী ছবি

এরপর এই ভাষায় সৃষ্টি হলো রামায়ণ, মহাভারতের মতো মহাকাব্য, ভগবদ্গীতা, নাটক, দর্শনশাস্ত্রসহ কত গ্রন্থ। সংস্কৃত শুধু একটি ভাষা নয়, এটি ছিল এক সভ্যতার প্রাণ। শিল্প-সাহিত্যের ভাষা। দর্শনের ভাষা। আধ্যাত্মিকতার ভাষা। হিন্দু, জৈন, বৌদ্ধসহ অনেক ধর্মীয় গ্রন্থ এই ভাষায় রচিত হয়েছে।

তবে ইতিহাসের আরেক দিকও আছে। সেটি হলো সাধারণ মানুষের ভাষা। প্রাচীন ভারতের স্থানীয় মানুষের সংস্কৃত ভাষায় কথা বলতে সমস্যা হতো। তারা কঠিন শব্দগুলোকে নিজেদের মতো করে বলত। তখন তাদের মুখে ভাষা বদলে যেত। সংস্কৃত শব্দ ‘হস্ত’ হয়ে যেত ‘হাত’। ‘মস্তক’ হয়ে যেত ‘মাথা’।

এভাবেই জন্ম নিল লোকভাষা। যাকে বলা হয় প্রাকৃত ভাষা। ভারতে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন প্রাকৃত ভাষা রয়েছে। যেমন মাগধী, অর্ধমাগধী, গৌড়ীয়, উড়িয়া, শৌরসেনী ইত্যাদি। এই ভাষায় রচিত হয়েছে নাটক ও সাহিত্য, লেখা হয়েছে শিলালিপি। খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ শতক থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত এই ভাষার ব্যবহার ছিল।

১৪৪ ধারা ভঙ্গ

পালি নামে আরও এক ভাষার কথা শোনা যায়। পালি ঠিক একক কোনো অঞ্চলের ভাষা নয়। এটি মূলত বিভিন্ন প্রাকৃত ভাষার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক ধর্মীয় ভাষা। বিশেষ করে বৌদ্ধধর্মের বাণী এই ভাষায় সংরক্ষিত হয়েছে। এক কথায় ত্রিপিটক গ্রন্থের ভাষা হলো পালি ভাষা।

ধীরে ধীরে ভাষা আবার বদলাতে থাকে। সময়ের সঙ্গে শব্দ পাল্টায়। উচ্চারণ বদলায়। ইন্দো-আর্য ভাষার শেষ স্তরকে বলা হয় অপভ্রংশ। এটি ছিল প্রাকৃত ভাষার পরিবর্তিত রূপ। অনেকে এটিকে সংস্কৃতের বিকৃত বা পরিবর্তিত রূপও বলেন। এই অপভ্রংশ থেকেই পরে জন্ম নেয় আধুনিক ভারতীয় ভাষাগুলো। বাংলা, হিন্দি, উর্দু, মৈথিলীসহ আরও অনেক ভাষা। আমাদের বাংলা ভাষাও এই ধারার অংশ।

তবে একটি প্রশ্ন এখনো আলোচনায় আছে। আর সেটা হলো কোন প্রাকৃত ভাষা থেকে বাংলা এসেছে? ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মনে করেন, বাংলা ভাষার উৎস মাগধী প্রাকৃত। অন্যদিকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মনে করেন, বাংলা ভাষা এসেছে গৌড়ীয় প্রাকৃত থেকে। মতভেদ আছে। তর্ক আছে। গবেষণা চলছে। কিন্তু একটি সত্য পরিষ্কার, তা হলো প্রাকৃত ভাষার বিবর্তন থেকেই জন্ম নিয়েছে বাংলা ভাষা। এই বাংলা ভাষাই আমাদের পরিচয়। আমাদের সংস্কৃতি। আমাদের হৃদয়ের শব্দ।

বইমেলা

‘বুক অ্যান্ড ফেয়ার’। ছোট্ট দুটো শব্দ। এ দুটো শব্দই একদিন ভীষণভাবে চমকে দিয়েছিল একজনকে। আর এই মানুষটি ছিলেন প্রয়াত কথাসাহিত্যিক সরদার জয়েনউদদীন। সে–ও অনেক দিন আগের কথা। গত শতাব্দীর ষাটের দশকের গোড়ার দিকের ঘটনা। তখন তিনি বাংলা একডেমিতে চাকরি করেন। সে সময় একাডেমি অনেক বিদেশি বই সংগ্রহ করত। এর মধ্যে একটি বই ছিল একেবারে অন্য রকম। বইটির নাম ‘ওয়ানডারফুল ওয়ার্ল্ড অব বুকস’। তিনি মুগ্ধ হয়ে বইটি পড়তে থাকেন । হঠাৎ দুটি শব্দে তাঁর চোখ আটকে যায়। ‘বুক ও ফেয়ার’। মানে! বইমেলা। দারুণ তো! বৈশাখী, নৌকাবাইচ, ঘোড়দৌড় মেলাসহ আরও কত মেলা আছে। বইমেলা নামে কিছু হতে পারে? এটা তিনি আগে কখনো ভাবেননি।

এ সময়ে তিনি ইউনিসেফের একটি বিশেষ প্রকল্পে যুক্ত হন। এ প্রকল্প তাঁর বইমেলার ভাবনাকে আরও উসকে দেয়। এটি ছিল শিশু–কিশোর গ্রন্থমেলা উন্নয়ন প্রকল্প। শিশু–কিশোরদের জন্য এ প্রকল্পে বইয়ের সংগ্রহ হয়। এসব বই নিয়ে ১৯৬৫ সালে তিনি একটি শিশু গ্রন্থমেলা করেন।

তবে তা সরদার জয়েনউদদীনকে তৃপ্ত করতে পারেনি। এ জন্য ১৯৭০ সালে নারায়ণগঞ্জে তিনি বড় পরিসরে একটি বইমেলার আয়োজন করেন। সবার আনন্দের জন্য এখানে একটি মজার বিষয় উপস্থাপন করেন। তিনি মেলায় একটি গরু বেঁধে রাখার ব্যবস্থা করেন। গরুটির গায়ে লেখা ছিল, ‘আমি বই পড়ি না।’ সরদার জয়েনউদদীনের এই কৌতুক সবাইকে যথেষ্ট হাসির খোরাক দিয়েছিল। অনেককে বই পড়ার প্রতিও আগ্রহী করে তুলেছিল।

এখানেই তিনি থেমে থাকেননি। তাঁর ভাবনার যেন শেষ নেই। ১৯৭২ সালকে ইউনেসকো ‘আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ’ ঘোষণা করে। সরদার জয়েনউদদীনও ওই বছরই গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হন। আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষকে কেন্দ্র করে ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে তিনি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একটি আন্তর্জাতিক গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন। সেই থেকেই বাংলা একাডেমিতে বইমেলার সূচনা।

এরপর একটু বিরতি। ১৯৭৪ সালে ছিল জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন। এ উপলক্ষে নিজামী, চিত্তবাবু, বর্ণমিছিলসহ কয়েকজন প্রকাশক কিছু বই নিয়ে একাডেমিতে আসেন। তাঁরা বই নিয়ে একাডেমির পুব দিকের দেয়াল ঘেঁষে বসে যান। ক্ষুদ্র পরিসরে এটাই ছিল বাংলা একাডেমির বইমেলা।

১৯৮৩ সালে বইমেলার ধারণার ব্যাপক পরিবর্তন আসে। কিন্তু এরশাদ শাসনের বিরুদ্ধে সে বছর ছাত্ররা মিছিল করে। শিক্ষা ভবনের সামনে ছাত্রদের উত্তাল মিছিল। মিছিলে ট্রাক তুলে দিয়ে দুজন শিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এ জন্য ১৯৮৩ সালে আর বইমেলা হয়নি।

পরিপূর্ণভাবে অমর একুশে বইমেলার শুরু হয় ১৯৮৪ সাল থেকে। এরপর প্রতিবছর এর আয়তন ও স্টলের পরিমাণ বাড়তে থাকে। এভাবে বাড়তে বাড়তে একপর্যায়ে বাংলা একাডেমির বইমেলা সম্প্রসারিত হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে কবি, সাহিত্যিক, লেখক, ঔপন্যাসিক, গল্পকার এক অর্থে যাঁরা বই প্রকাশ করতে চান, সবাই যেন মেলাকে ঘিরে বই প্রকাশের উদ্যোগ নেন।

এটা প্রায় নিশ্চিত করে বলা যায়, বইমেলার জন্যই বাংলাদেশের প্রকাশনাশিল্প সমৃদ্ধ হয়েছে। এক মাস ধরে চলে এই বইমেলা। পৃথিবীতে এত দীর্ঘ সময় ধরে আর কোনো বইমেলা চলে বলে জানা নেই। অমর একুশে বইমেলার প্রতি মানুষের প্রবল আগ্রহ। প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চল থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকেও বইপ্রেমীরা একুশের বইমেলায় আসেন।

আর আজ বইমেলা শুধু মেলা নয়; এটি এক সাংস্কৃতিক আন্দোলন। বাংলা একাডেমির সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও। বাংলা ভাষার ইতিহাস যেমন দীর্ঘ, তেমনি দীর্ঘ এর বইপ্রেমের উৎসবও।

কবি, লেখক ও সাংবাদিক, এবং মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক, বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ

Read full story at source